"আল্লাহ তাআলা নির্ভুল অনুপাতে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন। অবশ্যই বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে নির্দেশনা। (আন কাবুত ৪৪)
1. মনে করা হয় বৃহদাকার গ্রহগুলির অভ্যন্তরে উচ্চ চাপ ও তাপমাত্রায়, পানি আয়নিত অবস্থায় থাকে। ওই অবস্থায় পানির অণুগুলি ভেঙ্গে গিয়ে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আয়নের একটি মাধ্যম তৈরী করে। আরো বেশি চাপে অক্সিজেন কেলাসিত হয়ে গেলেও হাইড্রোজেন আয়নগুলি মুক্তভাবে অক্সিজেন আয়নের কেলাসের সজ্জার মধ্যে ভেসে বেড়ায়। এই বিশেষ অবস্থাকে পানির অতিআয়নিত অবস্থা বলে।[Weird water lurking inside giant planets, New Scientist,01 September 2010, Magazine issue 2776.]
https://bn.wikipedia.org/wiki/পানি
নবীজি (সা.) যেসব সন্তানের জন্য মহাসুসংবাদ দিয়েছেন
এ কারণেই ইসলাম মা-বাবার প্রতি সদাচরণকে ইবাদতের পরেই সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। বিশেষ করে মায়ের মর্যাদাকে এমন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে, যার তুলনা অন্য কোনো মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কুরআন ও হাদিসে মায়ের সম্মান, তার হক আদায় এবং তার প্রতি উত্তম আচরণের ব্যাপারে বারবার গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) মায়ের প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল সন্তানের জন্য জান্নাতের সুসংবাদও দিয়েছেন।
মায়ের ত্যাগের স্বীকৃতি দিয়েছে পবিত্র কুরআন
মায়ের কষ্ট, ত্যাগ এবং সন্তানের প্রতি তার অবদানের কথা আল্লাহ তাআলা নিজেই কুরআনে উল্লেখ করেছেন। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ ۖ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَىٰ وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ
‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয়েছে দুই বছরে। অতএব আমার এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা লোকমান: আয়াত ১৪)
গর্ভধারণ, প্রসব বেদনা, দুগ্ধপান করানো এবং সন্তানের লালন-পালনের অসংখ্য কষ্ট একজন মা অক্লান্তভাবে সহ্য করেন। তাই ইসলামে তার মর্যাদাও অসাধারণ উচ্চতায় উন্নীত করা হয়েছে।
মায়ের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আল্লাহর বাণী
মানুষ যেন তার মায়ের ত্যাগ কখনো ভুলে না যায়, সে জন্য কুরআনে আরও বলা হয়েছে—
حَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهًا وَوَضَعَتْهُ كُرْهًا
‘তার মা তাকে কষ্ট সহকারে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্ট সহকারে তাকে প্রসব করেছে।’ (সুরা আল-আহকাফ: আয়াত ১৫)
একই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন এক দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যা প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ে ধারণ করা উচিত—
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ
উচ্চারণ: রাব্বিক আইযি’নি আন আশকুরা নি’মাতাকাল্লাতি আনআ’মতা আলাইয়্যা ওয়া আলা ওয়ালিদাইয়্যা।’
অর্থ: ‘হে আমার রব! আমাকে সামর্থ্য দিন, যাতে আমি আপনার সেই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারি, যা আপনি আমার এবং আমার পিতা-মাতার প্রতি দান করেছেন।’ (সুরা আল-আহকাফ: আয়াত ১৫)
মা-বাবা: জান্নাত ও জাহান্নামের দরজা
রাসুলুল্লাহ (সা.) মা-বাবার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন—
الْوَالِدُ أَوْسَطُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ
‘পিতা-মাতা তোমার জন্য জান্নাত ও জাহান্নামের মাধ্যম।’ (ইবনে মাজাহ ৪২১)
অর্থাৎ মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে একজন মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে, আবার তাদের অসন্তুষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে।
মমতার দৃষ্টিতেই হজের সওয়াব
মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের গুরুত্ব বোঝাতে হাদিসে অসাধারণ একটি সুসংবাদ এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
مَا مِنْ وَلَدٍ بَارٍّ يَنْظُرُ إِلَى وَالِدَيْهِ نَظْرَةَ رَحْمَةٍ إِلَّا كَانَ لَهُ بِكُلِّ نَظْرَةٍ حَجَّةٌ مَبْرُورَةٌ
‘কোনো অনুগত সন্তান যখন তার মা-বাবার দিকে স্নেহ ও অনুগ্রহের দৃষ্টিতে তাকায়, তখন প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে আল্লাহ তাকে একটি কবুল হজের সওয়াব দান করেন।’ (বায়হাকি ৭৯০৫)
আরও পড়ুন
আল্লাহর প্রতি যে ধারণা মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি
আল্লাহর প্রতি যে ধারণা মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি
ইসলামে মায়ের মর্যাদা কেন এত বেশি?
ইসলাম মায়ের মর্যাদাকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তার সঙ্গে কাউকে শরিক কর না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ কর।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩৬)
এ আয়াতে আল্লাহর ইবাদতের পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা তাদের মর্যাদার গুরুত্ব স্পষ্ট করে।
‘তোমার মা, তোমার মা, তোমার মা’—নবীজির ঐতিহাসিক ঘোষণা
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন—
‘আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকার কার?’
রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তর দিলেন—
أُمُّكَ
‘তোমার মা।’
লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘তারপর কে?’
তিনি বললেন—
أُمُّكَ
‘তোমার মা।’
সে তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করলে তিনি আবারও বললেন—
أُمُّكَ
‘তোমার মা।’
চতুর্থবার প্রশ্ন করলে তিনি বললেন—
ثُمَّ أَبُوكَ
‘এরপর তোমার পিতা।’ (বুখারি ৫৯৭১, মুসলিম ২৫৪৮)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সন্তানের ওপর মায়ের অধিকার ও মর্যাদা কতটা মহান।
মা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং সবচেয়ে বড় দোয়ার ভাণ্ডার। তার ত্যাগ, ভালোবাসা ও মমতার প্রতিদান কোনো সন্তানই পূর্ণভাবে দিতে পারে না। তাই ইসলাম মায়ের সম্মান ও তার হক আদায়ের ব্যাপারে এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
যে সন্তান মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তার সেবা করে, তার মন জয় করতে সচেষ্ট থাকে এবং তার দোয়া অর্জনের চেষ্টা করে, সে প্রকৃত অর্থেই সৌভাগ্যবান। কারণ মায়ের সন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর মায়ের দোয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার অমূল্য চাবিকাঠি।
বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দল কত টাকা পাবে
আর মাত্র ৩ দিন পর মাঠে গড়াবে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে জনপ্রিয় টুর্নামেন্ট ফিফা বিশ্বকাপ। ফুটবল বিশ্বকাপের এবারের আসরের আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো।
বিশ্বকাপের এবারের আসরে মোট ৪৮টি দল ১০৪টি ম্যাচ খেলবে; যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচের রেকর্ড হবে। ৪৮ দলের এই আসর চলবে ৩৯ দিন। টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন এবং রানার্সআপ সহ প্রতিটি দলের জন্য রয়েছে প্রাইজমানির ব্যবস্থা।
বিশ্বকাপের এবারের আসরে ৮৭১ মিলিয়ন ডলার তথা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮ হাজার ৩২১ কোটি টাকা পুস্কার দেওয়া হবে। যে দল চ্যাম্পিয়ন হবে তারা পাবে ৫০ মিলিয়ন ডলার তথা ৬১৩ কোটি টাকা। গ্রুপপর্ব থেকে চ্যাম্পিয়ন সব পর্যায়ের দলের জন্যেই রয়েছে পুরস্কার।
বিশ্বকাপের রানার্সআপ দল পাবে ৩৩ মিলিয়ন ডলার। ৩য় ও ৪র্থ দল পাবে যথাক্রমে ২৯ ও ২৭ মিলিয়ন ডলার করে। এছাড়া যারা কোয়ার্টার ফাইনাল খেলবে তারা পাবে ১৯ মিলিয়ন ডলার এবং রাউন্ড অফ সিক্সটিনের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১৫ মিলিয়ন ডলার করে।
রাউন্ড অফ ৩২-এ উঠলেও রয়েছে পুরস্কার। সেখানে প্রত্যেক দল পাবে ১১ মিলিয়ন ডলার করে। যদি কোন দল গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেয় তাদেরও খালি হাতে ফিরতে হবে না। তারা পাবে ৯ মিলিয়ন ডলার করে।
ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ https://www.jugantor.com/sports/1110986
জারর্বাতা (এঊজইঊজঞ) ইতহিাসে ইনি ও পোপ দ্বতিীয় সলিভস্টোর(চড়ঢ়ব ঝুষাবংঃবৎ ২) নামে পরচিতি। অধবিাসী ফ্রান্স ৯৫০ সালে ফ্রান্সরে ওর্ভাগ্ররে (অটঠঊজএঘঊ) অর্ন্তগত অরল্যিাকরে (অঁৎরষষধপ) এ জন্ম গ্রহণ করনে
অরল্যিাকরে মঠে অধ্যায়নকালে তার প্রতশ্রিুতি প্রতভিাদীপ্ত মন- মননশীলতার দশে ও বদিশেরে খ্রষ্টিান র্ধমযাজকদরে দৃষ্টি আর্কষণ করে স্পনেরে বার সালোনাতে বসবাসকারী খ্রষ্টিান। ( ইঅজঝঅখঙঘঅ) যাজকবৃন্দ এই প্রতভিা বান ছাত্রটকিে উচ্চ শক্ষর্িাথে ফ্রান্স থকেে মুসলমি শাসতি র্কাডভাতে (ঈড়ৎফড়াধ) প্ররেন করনে। (ইতহিাসরে পাতা থকেে ০৩)
" তখনকার রীতইি ছলি তাই, সত্যকিার র্অথইে জ্ঞানার্আজন নমিত্তি,ে উচ্চ শক্ষর্িাথে
ইউরোপরে বভিন্নি অবীলরে মধোবী ছাত্রদরে তখন প্ররেন করা হতো মুসলমি শাষতি স্থানে "। (প্রাত্তম পৃ: ০৩)বশিষে করে র্কাডাভাত।ে( পৃ: ০৩)
মনীষী ঔড়যহ ডরষষরঁস উৎধঢ়বৎং তার বখ্যিাত
" অ ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ওহঃবষষবপঃঁধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ ঊঁৎড়ঢ়ব " গ্রন্থে র্দ্ব্যথহীন ভাষায়-
"আল্লাহ তাআলা নর্ভিুল অনুপাতে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করছেনে। অবশ্যই বশ্বিাসী সম্প্রদায়রে জন্য এতে রয়ছেে নর্দিশেনা।
(আন কাবুত ৪৪)
"সমগ্র সৃষ্টতিে একটি লক্ষণীয় বষিয় হলো নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল যখোনে যা কছিু রয়ছেে এসবরে মধ্যে নর্ভিুল আনুপাতকি চহ্নি খুঁজে পাওয়া যায়। এই অনুপাত নর্ধিারণরে মধ্যে প্রজ্ঞার প্রমাণ সুস্পষ্ট। যমেন পৃথবিী র্বতমান যে দূরত্বে অবস্থান করছে তার থকেে কয়কে সন্টেমিটিার যদি র্সূযরে কাছে যতেে তা হল পৃথবিী জ্বল-েপুড়ে লাল হয়ে শুক্র গ্রহরে অন্তরে বরেযি়ে যতে। আর যদি র্সূয থকেে মাত্র ১%দূরত্বে সরে যতে তাহলে এ পৃথবিী মঙ্গল গ্রহরে মত জমাট বাঁধা বরফে রূপান্তরতি
জাবির প্রথমই সর্ব বস্তু (পদার্থ বিজ্ঞান)-কেই প্রাণময় বলে স্বীকার করে অতি সুক্ষা অন্তস্থ চিরসত্যকে উদ্ভাবনী ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছেন।
পারদ ও গন্ধক, আত্মা ও দেহ, রূহ ও জিসম বা নফ্স, প্রাণময় দেহে যেমন ঔষধ প্রয়োগ বস্তুদেহের রাসায়নিক ঔষধ প্রয়োগ ফলোদয় হয়।
হাজার হাজার বছরের সাধনায় প্রকৃতি যেমন বিশুদ্ধ পারদ ও গন্ধকের আনবিক বিক্রিয়ায় অবশেষে খনিজ স্বর্ণ প্রসব করে, তেমনি অনুরূপ প্রক্রিয়ার অনুকরণে আল-কেমিস্টরাও স্বর্ণ প্রস্তুত করতে পারেন।
বৈজ্ঞানিকের সাধনার ধন এই আল-ইকসির বা পরশ মণি।
জাবির ইবনে হাইয়ান বলেছেন, “বৈজ্ঞানিকের সাধনার ধন এই আল-ইকসির বা পরশ মণি। ঔষধ নামক বিষ ঢুকে যেমন রোগ নিরাময়ের কাজ শুরু করে, তেমনি আল-ইকসির অপরিশুদ্ধ ধাতব দেহে ঢুকে আত্মার সঞ্জীবনী শক্তির ক্রিয়া শুরু করে। স্বর্ণ পরিণত হয়।
তাঁর হাতে ছিল, যার জন্য মণেরও উর্ধ্বে পরিমাণ ওজনের সোনার তাল প্রস্তুত করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন।
বিজ্ঞান যে পর্যন্ত মহাশক্তি অনুধাবনের একমাত্র হাতিয়ার প্রাণিজ শক্তি অধ্যত্মবাদকে স্বীকার না করবে, সে পর্যন্ত মহাশক্তির উৎসমূল খুঁজে পেতে পারেনা।
সমগ্র মুসলিম বিজ্ঞান জগতটাই ছিল অধ্যাত্মবাদভিক্তিক জ্ঞানের
সমগ্র মুসলিম বিজ্ঞান জগতটাই ছিল অধ্যাত্মবাদভিক্তিক জ্ঞানের। প্রায় সব শাখাতেই হাত থাকায়, এদের দূরদর্শিতার পরিমাণ ছিল বেশী। এজন্য স্বাভাবিকভাবে তাঁদের কার্যকলাপে বিজ্ঞানের সঙ্গে দর্শন প্রকৃতি জ্ঞান এসে মানসিক ক্ষেত্রেকে অলক্ষ্যে উন্নত ও পরিপুষ্ট করতে সাহায্য করত।
(২২৯)
মানসিক গঠনে অধ্যাত্ম মনন শক্তির স্বাভাবিক প্রভাবের আধিক্য থাকায় মূল সূত্রের সন্ধান তাঁদের জন্য সহজতর ছিল, যদিও ইবনে হাইয়ান রসায়ন বিজ্ঞানের জনক হিসাবে পরিগণিত হয়ে আছেন, কিন্তু স্বর্ণ আবিষ্কারের মূল সূত্রটি অধ্যাত্মবাদী হযরত আলী (রা) থেকেই প্রথম উদ্ভাবিত। যদিও ‘স্বর্ণ’ শব্দটি তিনি উচ্চারণ করেন নি, কিন্তু এর মৌলিক তত্ত্বের সন্ধান ও ফল পরিমাণ স্পষ্টভাবেই বলে দিয়ে গেছেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা)-ও বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তোমারা জ্ঞান-বিজ্ঞানকে যদি আঁকড়ে ধর, তাহলে বিশ্বে নেতৃত্ব করতে পারবে।
পদার্থ রূপানতর প্রক্রিয়া
সংমিশ্রণে নতুন ধাতু সৃষ্টি সম্বন্ধে জাবিরের মত হলো, রাসায়নিকভাবে প্রস্তুত বা খনিজ ধাতু পারদ গন্ধক ছাড়া যার কোন মৌলিক ধাতু বা পদার্থের অস্তিত্বই নেই। সুতরাং অন্য কিছু থেকে দ্বিতীয় ধাতু তৈয়ার করা অর্থহীন। সব রকম ধাতুই যখন পারদ আর গন্ধক দ্বারা গঠিত, তখন বৈজ্ঞানিকরা যে ধাতুতে পারদ বা পন্ধকের যে উপাদান কম আছে সেটা যোগ করে দিতে পারেন অথবা যে ধাতুতে যে উপাদান বেশী আছে, সেটাকে বের করে দেওয়াই তাঁদের কাজ।
আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণ সাজ তৈয়ার করতে পারে না।
জাবিরের মত হলোÑপারদ আর গন্ধক সংমিশ্রণে মূল ধাতুই যখন তৈয়ার করা যায়, তখন সঙ্কর ধাতু নির্মাণ বোকামী। শঙ্কর ধাতুর দ্বারা পৃথিবীতে ধাতুর পরিমাণ বৃদ্ধি পায় না। অর্থাৎ নতুন ধাতু তৈরী হয় না।
(২২৭) (হাতের লেখা) (মাওলানা আবদুল হক কে স্বর্ণ প্রস্তুত প্রণালী শেখানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন এক আধ্যাত্মিক পুরুষ ।
ইবনে সিনাকে সুলতান কাবুস এর অর্ধ্ব রাজ্য দানের ইচ্ছার পিছনে ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
ইবনে সিনাকে সুলতান কাবুস এর অর্ধ্ব রাজ্য দানের ইচ্ছার পিছনে ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সুলতান কাবুস অধিক মূল্যবান মনে করতেন।
এক হস্তী পরিমান রৌপ্যের উদ্দেশ্য এক হস্তি পরিমাণ স্বর্ণ আদায়)
খালিদ নাকি স্বণৃ ও পরশ পাথর তৈয়ার করেছিলেন। তিনি ছিলেন নিজেই রাজকীয় শক্তিধর। দুর্দান্ত সাহসী জাবির ইবনে হাইয়ান স্বর্ণ ও পরশ পাথর তৈয়ার করতে গিয়ে আজীবন যেখানেই গিয়েছেন, দুর্যোগ, দুশ্চিন্তা ও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই ছাড়া সুক-শান্তির মুখ দেখতে পান নি। ইবনে সিনাকে সুলতান কাবুস অর্ধ রাজতœ দান করতে চেয়েছিলেন কোন্ মোহে ? ইবনে সিনাকে রাজত্ব দানের প্রস্তাব প্রদান হয়ত স্বর্ণ প্রস্তুতের ফর্মুলা হাতে পাওয়ার লোভেই। সুলতান মাহমুদের আল বিরুনী ও ইবনে সিনাকে বল প্রয়োগে করায়ত্ত করার প্রচেষ্টার পিছনেও ছিল হয়ত এই স্বর্ণমোহ। তা না হলে ইবনে সিনাকে ধরার জন্য খাওয়ারিজম সুলতানকে হত্যা ও রাজ্য দখল করেও তৃপ্ত না হয়ে, একটি মাত্র ব্যক্তির জন্য সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপী অনুসন্ধানের ব্যাপক তল্লাশী অভিযানের এত উত্তেজনা ও তৎপরতা কেন ?
আল-বিরুনীকে একটি হস্তী পরিমাণ রৌপ্য দান করতে চেয়েছিলেন।
এই রাজা বাদশাহগণ শত মণ স্বর্ণ দ্বারা সেনাবাহিনী গঠন করে রাজ্যের পর রাজ্য জয় করে বিশ্ববিজয়ী হতে চান। সুলতান মাহমুদ মৃত্যুর পর সুলতান মাসউদ ‘কানুনে
মাসউদী’-কে উপলক্ষ করে আল-বিরুনীকে একটি হস্তী পরিমাণ রৌপ্য দান করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু আল-বিরুনী এই দান গ্রহণ করেন নি। তিনি জানতেন তিনি যদি এক হস্তী পরিমাণ রৌপ্য গ্রহণ করেন, তাহলে বিনিময়ে তাঁকে সুলতানকে এক হস্তী পরিমাণ স্বর্ণ তৈয়ার করে দিতে হবে। আল-বিরুনী জাবির ইবনে হাইয়ানের মত দুঃসাহসী হতে রাযী হন নি। জাবির ছিলেন। আবিষ্কারের জন্য পাগল। স্বর্ণ প্রস্তুত ব্যাপারে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেপরোয়া সাহসী।
(হাতের লেখা) বিশ্বের বিদ্যমান অশান্তির মূলে রয়েছে অখন্ড একক মানব সত্বার বিভক্তি, বিভাজন। “সমগ্রহ মানব এক জাতি।” (আল কুরআন)
যুগে যুগে সময়ে সময়ে আল্লাহপাক অগণিত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামদের এ জগতে পাঠিয়েছে যে অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা হচ্ছে আকিদাগত বিভক্ত মানবকে পুনরায় অখন্ড জাতি সত্বায় ফিরিয়ে আনা। এতে কেউ ফিরেছে কেউ ফিরেনি। এত প্রতীয়মান যে, মানব বিভক্তি ধর্মীয় কারণে নয়, ধর্মাবলম্বীর কারণে সৃষ্ট। মূল আকিদার বিকৃত করনের ফসল এই অখন্ড মানব সত্তার দ্বিধা-বিভক্তি। এই বিভক্তি এত সুক্ষè, তীক্ষè ও জটিল যে, তাতে সমগ্র মানব মন্ডলীর এক জাতিতে পরিণত হওয়া বড়ই সময় সাপেক্ষ। সাধারণ্যের আওতা বর্হিভূত, এটি উচ্চ আধ্যাত্মিক ব্যাপার বটে। কিন্তু এর সহজ পথ হচ্ছে জ্ঞান ভিত্তিক বিশ্ব ঐক্য। তা আধ্যাত্মিক হোক কিংবা না হোক।
* অপঃরড়হ ঃড় অপঃরড়হ = বস্তুর ক্ষেত্রে
অপঃরড়হ ঃড় চৎড়ধপঃরড়হ = শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, হীন প্রাণীর ক্ষেত্রেও যেমন কুকুর তেমন মুত্তর = সব কুকুরের জন্য নয়, ক্ষ্যাপা কুকুর ব্যতীত, কুকুর মাত্র মুত্তর নয় যেমন মানুষ তেমন মাওর = কোন মানুষের জন্য নয়, মানুষ যতই অপরাধী হোক সর্ব প্রথম দরকার মানুষের অমানুষী কাজের সংশোধনের সুযোগ প্রদান, ধৈয্যের সাথে অমানুষী কাজ সহ্য করা এবং ক্ষমা করা। তাতেই সম্ভব অমানুষ মানুষে পরিণত হওয়া।
মন্দকে ভাল দ্বারা মোকাবিলা কর। দিল দিয়ে দ্বীন অন্যায়কে ন্যায় দ্বারা মন্দকে ভাল দ্বার ঘৃণাকে ভালবাসা দ্বারা যে আত্মীয় ঘৃণার সাথে কোন আত্মীয়কে এড়িয়ে যায় হাদীস মতে সে আত্মীয়কে ভালবেসে আত্মীয়তা রক্ষা করা
যত হিংসা বিদ্বেষ
তত হিংসা বিদ্বেষ নয়
তত ধৈর্য্য, ক্ষমা, ভালবাসা।
কেবল আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেই
অপঃরড়হ ঃড় অপঃরড়হ
(২২৮)
আসমান-যমনিে যা কছিু আছে সবই আল্লাহর জকিরিরত
দামাস্কাসে যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণের কারখানা
মিসরে দামাস্কাসে যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণের কারখানা থাকা সত্ত্বেও খলীফা আবদুল মালিক তিউনিসে একটি বিশাল যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণের কারখানা স্থাপন করেন।১
ইবনে কাসিমকে ভারতে রাজ্য বিস্তারের সুবর্ণ সুযোগ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। খলীফা হিশামের সময় রাজ্য বিস্তারের প্রচেষ্টাও ব্যাহত হয় অর্থাৎ খলীফা ওয়ালিদের পর থেকে রাজ্য বিস্তারের যে মন্দাগতি দেখা দেয় আব্বাসীয়গণ সুপ্রতিষ্ঠিত সা¤্রাজ্য হাতে পেয়েও, তাঁদের সা¤্রাজ্যের আকার-আকৃতি সঙ্কোচন ছাড়া সেই সা¤্রাজ্য তেমন সম্প্রসারিত আর হয়নি।
১. আল-মুকাদ্দমা ঃ ইবনে খালদূন, পৃষ্ঠা ১২০।
(২৩৩)
এর অর্থ উমাইয়ারা যেভাবে খালিদের রাসায়নিক স্বর্ণ শক্তি ব্যবহার করতে পেরেছিল, ইবনে হাইয়ানকে হাতে পেয়েও আব্বাসীয়রা তাকে ব্যবহার করতে পারে নি। হারুন-অর-রশীদ বার্মাকী বংশ উৎখাতের চ- নীতি অনুসরণ না করে ইবনে হাইয়ানের বিজ্ঞান প্রতিভাকে যদি যথাযথভাবে ব্যবহার করতেন, হয়ত বাগদাদের ইতিহাস অন্য ভাবে লেখা হতো।
ইবনে হাইয়ান কেন, ইতিহাসের ঘটনাদৃষ্টে মনে হয়, আরও বহু বিখ্যাত মুসলিম বৈজ্ঞানিকই স্বর্ণ প্রস্তুত করতে পাতেন। এখানে হাইয়ান প্রসঙ্গেই কথা বলছি।
বর্তমানের বৈজ্ঞানিক ও রাসায়নিকরা বিভিন্ন ধাতুর সংমিশ্রণে নতুন ধাতু প্রস্তুতের পক্ষপাতী। কিন্তু ইবনে হাইয়ান ম্যেলিক পদ্ধতিতে ছিলেন। তাঁর মতে “এক প্রকারের ভিজা এবং শুষ্ক খনিজ বাষ্প থেকে হাজার হাজার বছরের খনিজ ক্রমোন্নয়নে পারদ ও গন্ধকে পরিণত হয় এবং পারদ গন্ধক থেকেই বিভিন্ন প্রকারের ধাতু উৎপন্ন হয়। তাহলে মৌলিক পদার্থ হলো বাষ্প।
(হাতের লেখা) পারদ ও গন্ধক সৃষ্টি রহস্য হাইয়ানের মতে এক প্রকার ভিজা ও শুষ্ক বাষ্প থেকে হাজার হাজার বছরের খনিজ ক্রমান্বয়ে পারদ ও গন্ধকে পরিণত হয়।
আল্লাহপাক ফরমান : আমি পানি থেকে সৃষ্টির সূচনা করি।)
এখানে একটা কথা মনে পড়ে। খৃস্টপূর্ব ৬২৪Ñ৫৬৫ অব্দে গ্রীক বৈজ্ঞানিক থিলিস অব মিলিটুন পানিই সৃষ্টি মূল উপাদান তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। ইবনে সিনা বলছেনÑমাটির উৎপত্তিও পানি থেকে। কারণ পানিতে মৃত্তিকা গুণ বেশী। পানি ক্রমশ জমাট হয়ে কাদায় পরিণত হয়। কাদা থেকে মাটি, পাহাড়-পর্বত, গাছ-পালা ইত্যাদি গড়ে উঠে। ইবনে হাইয়ান বলেন, ধাতুর উৎপত্তির মূলে পানি নয়, বাষ্প।
সৃষ্টিতত্ত্বের মূলে মিলিটুস বলেনÑপানি এবং ইবনে সিনাও বলেন পানি।
ইবনে হাইয়ান বলেনÑসব ধাতুর সৃষ্টির মূলে রয়েছে বাষ্প। (বাস্প মূলতঃ পানরিই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্রাংশ মাত্র।)
বাষ্প মানেই আত্মা (রূহ)। অর্থাৎ সবই আল্লাহ্র শক্তি বা নূর।
পাতন (ফরংঃরষষধঃরড়হ), উর্ধ্ব পাতন (ঝঁনষবসধঃরড়হ), পরি¯্রাবণ (ঋরষঃৎধঃরড়হ), দ্রবণ (ঝড়ষঁঃরড়হ)
(হাতের লেখা) রসূল সাঃ ইহুদী পন্ডিত আবদুল্লাহ ইবনে সালামের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, মাটি সমূদ্রের ফেনা থেকে উৎপন্ন। (সমূদ্রের ফেনা থেকে কাদা, কাদা পানি থেকে উৎপন্ন)
মাসউদী’-কে উপলক্ষ করে আল-বিরুনীকে একটি হস্তী পরিমাণ রৌপ্য দান করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু আল-বিরুনী এই দান গ্রহণ করেন নি। তিনি জানতেন তিনি যদি এক হস্তী পরিমাণ রৌপ্য গ্রহণ করেন, তাহলে বিনিময়ে তাঁকে সুলতানকে এক হস্তী পরিমাণ স্বর্ণ তৈয়ার করে দিতে হবে। আল-বিরুনী জাবির ইবনে হাইয়ানের মত দুঃসাহসী হতে রাযী হন নি। জাবির ছিলেন। আবিষ্কারের জন্য পাগল। স্বর্ণ প্রস্তুত ব্যাপারে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেপরোয়া সাহসী।
(হাতের লেখা) বিশ্বের বিদ্যমান অশান্তির মূলে রয়েছে অখন্ড একক মানব সত্বার বিভক্তি, বিভাজন। “সমগ্রহ মানব এক জাতি।” (আল কুরআন)
যুগে যুগে সময়ে সময়ে আল্লাহপাক অগণিত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামদের এ জগতে পাঠিয়েছে যে অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা হচ্ছে আকিদাগত বিভক্ত মানবকে পুনরায় অখন্ড জাতি সত্বায় ফিরিয়ে আনা। এতে কেউ ফিরেছে কেউ ফিরেনি। এত প্রতীয়মান যে, মানব বিভক্তি ধর্মীয় কারণে নয়, ধর্মাবলম্বীর কারণে সৃষ্ট। মূল আকিদার বিকৃত করনের ফসল এই অখন্ড মানব সত্তার দ্বিধা-বিভক্তি। এই বিভক্তি এত সুক্ষè, তীক্ষè ও জটিল যে, তাতে সমগ্র মানব মন্ডলীর এক জাতিতে পরিণত হওয়া বড়ই সময় সাপেক্ষ। সাধারণ্যের আওতা বর্হিভূত, এটি উচ্চ আধ্যাত্মিক ব্যাপার বটে। কিন্তু এর সহজ পথ হচ্ছে জ্ঞান ভিত্তিক বিশ্ব ঐক্য। তা আধ্যাত্মিক হোক কিংবা না হোক।
* অপঃরড়হ ঃড় অপঃরড়হ = বস্তুর ক্ষেত্রে
অপঃরড়হ ঃড় চৎড়ধপঃরড়হ = শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, হীন প্রাণীর ক্ষেত্রেও যেমন কুকুর তেমন মুত্তর = সব কুকুরের জন্য নয়, ক্ষ্যাপা কুকুর ব্যতীত, কুকুর মাত্র মুত্তর নয় যেমন মানুষ তেমন মাওর = কোন মানুষের জন্য নয়, মানুষ যতই অপরাধী হোক সর্ব প্রথম দরকার মানুষের অমানুষী কাজের সংশোধনের সুযোগ প্রদান, ধৈয্যের সাথে অমানুষী কাজ সহ্য করা এবং ক্ষমা করা। তাতেই সম্ভব অমানুষ মানুষে পরিণত হওয়া।
মন্দকে ভাল দ্বারা মোকাবিলা কর। দিল দিয়ে দ্বীন অন্যায়কে ন্যায় দ্বারা মন্দকে ভাল দ্বার ঘৃণাকে ভালবাসা দ্বারা যে আত্মীয় ঘৃণার সাথে কোন আত্মীয়কে এড়িয়ে যায় হাদীস মতে সে আত্মীয়কে ভালবেসে আত্মীয়তা রক্ষা করা
যত হিংসা বিদ্বেষ
তত হিংসা বিদ্বেষ নয়
তত ধৈর্য্য, ক্ষমা, ভালবাসা।
কেবল আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেই
অপঃরড়হ ঃড় অপঃরড়হ
(২২৮)
আসমান-যমনিে যা কছিু আছে সবই আল্লাহর জকিরিরত
জাবিরের মতে, সোনা-রূপা, লোহা প্রভৃতি যত প্রকার ধাতু আছে, কোন ধাতুই মৌলিকতা নেই। এইসব ধাতুই পারদ আর গন্ধকের সমন্বয়ে গঠিত হয়। খনিজ ধাতু খনিতে যে নিয়মে গঠিত হয়, সেই নিয়মে মানুষও এই ধাতু তৈয়ার করতে পারে।
জাবিরের মতে এইসব রূহ বা জীবনীশক্তি সম্পন্ন পদার্থ হাজার হাজার বছর ধরে মাটির নীচে চাপা পড়া অবস্থায় তাদের ক্রমোন্নয়নের কাজ স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে। এইসব আত্মা সমৃদ্ধ পদার্থ পূর্ণতা লাভের পূর্ব পর্যন্ত মাটির নিচে বন্দী অবস্থায় নানা প্রকার স্বাভাবিক রাসায়নিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়্ প্রথমত, শুষ্ক ও ধোঁয়াটে জিনিসগুলো গন্ধকের মত দ্রব্যে পরিণত হয়। যেগুলো আর্দ্র ও বাষ্পময় সেসব পারদের আকার ধারণ করে। প্রত্যেক ধাতুর মধ্যে গন্ধক ও পারদÑএই দুই অবস্থার জিনিসই নান অনুপাতে বিদ্যমান এবং সেগুলো পূর্ণ পরিণতির দিকে এগিয়ে চলে। ওদের প্রথম অশুদ্ধ অবস্থা ক্রমান্বয়ে পরিশুদ্ধ হয়ে গন্ধক আর পারদ সংমিশ্রণে রাসায়নিক ক্রমোন্নয়নের পরিশুদ্ধির মান অনুযায়ী স্বর্ণ, লৌহ, তামা প্রভৃতি ধাতুতে পরিণত হয়। এই দুই মৌলিক পদার্থ গন্ধক আর পারদ ছাড়া স্বর্ণ, লৌহ প্রভৃতি ধাতু পূর্ণ পরিণতি লাভ করতে পারে না।
পদার্থের উদ্ভব কি ভাবে ? মুসলিম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
(হাতের লেখা) পদার্থের উদ্ভব কি ভাবে ? মুসলিম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
বৈজ্ঞানিকের কাজ হলোÑখনিতে মাটি চাপা থেকে হাজার হাজার বছরে প্রকৃতিক রাসায়নিক বিবর্তনে যে প্রকার ক্রমবিকাশের পরিণতিতে পারদ ও গন্ধক থেকে স্বর্ণ-লৌহ প্রভৃতি খনিজ পদার্থ প্রস্তুত হয়, সেই প্রাকৃতিক ক্রমোন্নয়নের পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার প্রণালী উদ্ভাবন করা। তাঁর মতে খনিজ ধাতু এবং রাসায়নিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত দাতু অনুরূপ বা এক কথাই। ‘কিতাবুল খাওস’-এ তিনি আরো বলেন যে, সমস্ত খনিজ পদার্থÑধাতু জাতীয় হোক বা না হোক গন্ধক, পারদ, স্বর্ণ এবং নিশাদল দিয়ে গঠিত।
তামা, রূপা, লোহা তৈরীর তত্ত্ব কথাÑ
জাবির এবং পরবর্তীকালে ইবনে সিনা পরীক্ষার মাধ্যমে এই অভিমত পোষণ করেন যে, বিশুদ্ধ গন্ধক সোনালী রং ধারণ করে। সম্পর্ণ বিশুদ্ধ পারদ ও বিশুদ্ধ গন্ধক একত্রে যদি বিশুদ্ধ হয় এবং পারদ যদি অপরিশুদ্ধ থাকে, তাহলে অথবা পারদ বিশুদ্ধ, গন্ধক অপরিষ্কার কিংবা গন্ধক পারদ দুটোই অপরিশোধিত অবস্থায় জড়িয়ে কঠিন করে নিলে তামা রূপা ও লৌহে পরিণত হয়। জাবিরের মতে, রাসায়নিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত স্বর্ণ, লৌহা প্রভৃতি খনিজ স্বর্ণ-লৌহের মত একই মান সম্পন্ন।
(হাতের লেখা) গন্ধক + পারদ + স্বর্ণ + নিশাদল = বস্তু/পদার্থ পঠিত।
(২২৬)
বর্তমান বৈজ্ঞানিকরা মৌলিক সুক্ষা রাসায়নিক বিশ্লেষণ বুদ্ধি ও সংশ্লেষণের দক্ষতার অভাবে স্বর্ণ, লৌহ প্রভৃতি ধাতু প্রস্তুতে ব্যর্থ হয়েছেন। এরূপ নির্মাণ জটিলতা অসম্ভব মনে করে অথবা এরূপ সৃষ্টি জটিলতায় না গিয়ে একটি ধাতুর সঙ্গে আর একটি বা একাধিক ধাতুর সংমিশ্রণে আর একটি নতুন ধাতুর উৎপত্তির সহজ পন্থাই আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণ অবলম্বন করেন।
মাসউদী’-কে উপলক্ষ করে আল-বিরুনীকে একটি হস্তী পরিমাণ রৌপ্য দান করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু আল-বিরুনী এই দান গ্রহণ করেন নি। তিনি জানতেন তিনি যদি এক হস্তী পরিমাণ রৌপ্য গ্রহণ করেন, তাহলে বিনিময়ে তাঁকে সুলতানকে এক হস্তী পরিমাণ স্বর্ণ তৈয়ার করে দিতে হবে। আল-বিরুনী জাবির ইবনে হাইয়ানের মত দুঃসাহসী হতে রাযী হন নি। জাবির ছিলেন। আবিষ্কারের জন্য পাগল। স্বর্ণ প্রস্তুত ব্যাপারে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেপরোয়া সাহসী।
(হাতের লেখা) বিশ্বের বিদ্যমান অশান্তির মূলে রয়েছে অখন্ড একক মানব সত্বার বিভক্তি, বিভাজন। “সমগ্রহ মানব এক জাতি।” (আল কুরআন)
যুগে যুগে সময়ে সময়ে আল্লাহপাক অগণিত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামদের এ জগতে পাঠিয়েছে যে অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা হচ্ছে আকিদাগত বিভক্ত মানবকে পুনরায় অখন্ড জাতি সত্বায় ফিরিয়ে আনা। এতে কেউ ফিরেছে কেউ ফিরেনি। এত প্রতীয়মান যে, মানব বিভক্তি ধর্মীয় কারণে নয়, ধর্মাবলম্বীর কারণে সৃষ্ট। মূল আকিদার বিকৃত করনের ফসল এই অখন্ড মানব সত্তার দ্বিধা-বিভক্তি। এই বিভক্তি এত সুক্ষè, তীক্ষè ও জটিল যে, তাতে সমগ্র মানব মন্ডলীর এক জাতিতে পরিণত হওয়া বড়ই সময় সাপেক্ষ। সাধারণ্যের আওতা বর্হিভূত, এটি উচ্চ আধ্যাত্মিক ব্যাপার বটে। কিন্তু এর সহজ পথ হচ্ছে জ্ঞান ভিত্তিক বিশ্ব ঐক্য। তা আধ্যাত্মিক হোক কিংবা না হোক।
* অপঃরড়হ ঃড় অপঃরড়হ = বস্তুর ক্ষেত্রে
অপঃরড়হ ঃড় চৎড়ধপঃরড়হ = শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, হীন প্রাণীর ক্ষেত্রেও যেমন কুকুর তেমন মুত্তর = সব কুকুরের জন্য নয়, ক্ষ্যাপা কুকুর ব্যতীত, কুকুর মাত্র মুত্তর নয় যেমন মানুষ তেমন মাওর = কোন মানুষের জন্য নয়, মানুষ যতই অপরাধী হোক সর্ব প্রথম দরকার মানুষের অমানুষী কাজের সংশোধনের সুযোগ প্রদান, ধৈয্যের সাথে অমানুষী কাজ সহ্য করা এবং ক্ষমা করা। তাতেই সম্ভব অমানুষ মানুষে পরিণত হওয়া।
মন্দকে ভাল দ্বারা মোকাবিলা কর। দিল দিয়ে দ্বীন অন্যায়কে ন্যায় দ্বারা মন্দকে ভাল দ্বার ঘৃণাকে ভালবাসা দ্বারা যে আত্মীয় ঘৃণার সাথে কোন আত্মীয়কে এড়িয়ে যায় হাদীস মতে সে আত্মীয়কে ভালবেসে আত্মীয়তা রক্ষা করা
যত হিংসা বিদ্বেষ
তত হিংসা বিদ্বেষ নয়
তত ধৈর্য্য, ক্ষমা, ভালবাসা।
কেবল আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেই
অপঃরড়হ ঃড় অপঃরড়হ
(২২৮)
আসমান-যমনিে যা কছিু আছে সবই আল্লাহর জকিরিরত
জাবিরের মতে, সোনা-রূপা, লোহা প্রভৃতি যত প্রকার ধাতু আছে, কোন ধাতুই মৌলিকতা নেই। এইসব ধাতুই পারদ আর গন্ধকের সমন্বয়ে গঠিত হয়। খনিজ ধাতু খনিতে যে নিয়মে গঠিত হয়, সেই নিয়মে মানুষও এই ধাতু তৈয়ার করতে পারে।
জাবিরের মতে এইসব রূহ বা জীবনীশক্তি সম্পন্ন পদার্থ হাজার হাজার বছর ধরে মাটির নীচে চাপা পড়া অবস্থায় তাদের ক্রমোন্নয়নের কাজ স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে। এইসব আত্মা সমৃদ্ধ পদার্থ পূর্ণতা লাভের পূর্ব পর্যন্ত মাটির নিচে বন্দী অবস্থায় নানা প্রকার স্বাভাবিক রাসায়নিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়্ প্রথমত, শুষ্ক ও ধোঁয়াটে জিনিসগুলো গন্ধকের মত দ্রব্যে পরিণত হয়। যেগুলো আর্দ্র ও বাষ্পময় সেসব পারদের আকার ধারণ করে। প্রত্যেক ধাতুর মধ্যে গন্ধক ও পারদÑএই দুই অবস্থার জিনিসই নান অনুপাতে বিদ্যমান এবং সেগুলো পূর্ণ পরিণতির দিকে এগিয়ে চলে। ওদের প্রথম অশুদ্ধ অবস্থা ক্রমান্বয়ে পরিশুদ্ধ হয়ে গন্ধক আর পারদ সংমিশ্রণে রাসায়নিক ক্রমোন্নয়নের পরিশুদ্ধির মান অনুযায়ী স্বর্ণ, লৌহ, তামা প্রভৃতি ধাতুতে পরিণত হয়। এই দুই মৌলিক পদার্থ গন্ধক আর পারদ ছাড়া স্বর্ণ, লৌহ প্রভৃতি ধাতু পূর্ণ পরিণতি লাভ করতে পারে না।
পদার্থের উদ্ভব কি ভাবে ? মুসলিম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
(হাতের লেখা) পদার্থের উদ্ভব কি ভাবে ? মুসলিম বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
বৈজ্ঞানিকের কাজ হলোÑখনিতে মাটি চাপা থেকে হাজার হাজার বছরে প্রকৃতিক রাসায়নিক বিবর্তনে যে প্রকার ক্রমবিকাশের পরিণতিতে পারদ ও গন্ধক থেকে স্বর্ণ-লৌহ প্রভৃতি খনিজ পদার্থ প্রস্তুত হয়, সেই প্রাকৃতিক ক্রমোন্নয়নের পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার প্রণালী উদ্ভাবন করা। তাঁর মতে খনিজ ধাতু এবং রাসায়নিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত দাতু অনুরূপ বা এক কথাই। ‘কিতাবুল খাওস’-এ তিনি আরো বলেন যে, সমস্ত খনিজ পদার্থÑধাতু জাতীয় হোক বা না হোক গন্ধক, পারদ, স্বর্ণ এবং নিশাদল দিয়ে গঠিত।
তামা, রূপা, লোহা তৈরীর তত্ত্ব কথাÑ
জাবির এবং পরবর্তীকালে ইবনে সিনা পরীক্ষার মাধ্যমে এই অভিমত পোষণ করেন যে, বিশুদ্ধ গন্ধক সোনালী রং ধারণ করে। সম্পর্ণ বিশুদ্ধ পারদ ও বিশুদ্ধ গন্ধক একত্রে যদি বিশুদ্ধ হয় এবং পারদ যদি অপরিশুদ্ধ থাকে, তাহলে অথবা পারদ বিশুদ্ধ, গন্ধক অপরিষ্কার কিংবা গন্ধক পারদ দুটোই অপরিশোধিত অবস্থায় জড়িয়ে কঠিন করে নিলে তামা রূপা ও লৌহে পরিণত হয়। জাবিরের মতে, রাসায়নিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত স্বর্ণ, লৌহা প্রভৃতি খনিজ স্বর্ণ-লৌহের মত একই মান সম্পন্ন।
(হাতের লেখা) গন্ধক + পারদ + স্বর্ণ + নিশাদল = বস্তু/পদার্থ পঠিত।
(২২৬)
বর্তমান বৈজ্ঞানিকরা মৌলিক সুক্ষা রাসায়নিক বিশ্লেষণ বুদ্ধি ও সংশ্লেষণের দক্ষতার অভাবে স্বর্ণ, লৌহ প্রভৃতি ধাতু প্রস্তুতে ব্যর্থ হয়েছেন। এরূপ নির্মাণ জটিলতা অসম্ভব মনে করে অথবা এরূপ সৃষ্টি জটিলতায় না গিয়ে একটি ধাতুর সঙ্গে আর একটি বা একাধিক ধাতুর সংমিশ্রণে আর একটি নতুন ধাতুর উৎপত্তির সহজ পন্থাই আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণ অবলম্বন করেন।
দামাস্কাসে যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণের কারখানা
মিসরে দামাস্কাসে যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণের কারখানা থাকা সত্ত্বেও খলীফা আবদুল মালিক তিউনিসে একটি বিশাল যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণের কারখানা স্থাপন করেন।১
ইবনে কাসিমকে ভারতে রাজ্য বিস্তারের সুবর্ণ সুযোগ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। খলীফা হিশামের সময় রাজ্য বিস্তারের প্রচেষ্টাও ব্যাহত হয় অর্থাৎ খলীফা ওয়ালিদের পর থেকে রাজ্য বিস্তারের যে মন্দাগতি দেখা দেয় আব্বাসীয়গণ সুপ্রতিষ্ঠিত সা¤্রাজ্য হাতে পেয়েও, তাঁদের সা¤্রাজ্যের আকার-আকৃতি সঙ্কোচন ছাড়া সেই সা¤্রাজ্য তেমন সম্প্রসারিত আর হয়নি।
১. আল-মুকাদ্দমা ঃ ইবনে খালদূন, পৃষ্ঠা ১২০।
(২৩৩)
এর অর্থ উমাইয়ারা যেভাবে খালিদের রাসায়নিক স্বর্ণ শক্তি ব্যবহার করতে পেরেছিল, ইবনে হাইয়ানকে হাতে পেয়েও আব্বাসীয়রা তাকে ব্যবহার করতে পারে নি। হারুন-অর-রশীদ বার্মাকী বংশ উৎখাতের চ- নীতি অনুসরণ না করে ইবনে হাইয়ানের বিজ্ঞান প্রতিভাকে যদি যথাযথভাবে ব্যবহার করতেন, হয়ত বাগদাদের ইতিহাস অন্য ভাবে লেখা হতো।
ইবনে হাইয়ান কেন, ইতিহাসের ঘটনাদৃষ্টে মনে হয়, আরও বহু বিখ্যাত মুসলিম বৈজ্ঞানিকই স্বর্ণ প্রস্তুত করতে পাতেন। এখানে হাইয়ান প্রসঙ্গেই কথা বলছি।
বর্তমানের বৈজ্ঞানিক ও রাসায়নিকরা বিভিন্ন ধাতুর সংমিশ্রণে নতুন ধাতু প্রস্তুতের পক্ষপাতী। কিন্তু ইবনে হাইয়ান ম্যেলিক পদ্ধতিতে ছিলেন। তাঁর মতে “এক প্রকারের ভিজা এবং শুষ্ক খনিজ বাষ্প থেকে হাজার হাজার বছরের খনিজ ক্রমোন্নয়নে পারদ ও গন্ধকে পরিণত হয় এবং পারদ গন্ধক থেকেই বিভিন্ন প্রকারের ধাতু উৎপন্ন হয়। তাহলে মৌলিক পদার্থ হলো বাষ্প।
(হাতের লেখা) পারদ ও গন্ধক সৃষ্টি রহস্য হাইয়ানের মতে এক প্রকার ভিজা ও শুষ্ক বাষ্প থেকে হাজার হাজার বছরের খনিজ ক্রমান্বয়ে পারদ ও গন্ধকে পরিণত হয়।
আল্লাহপাক ফরমান : আমি পানি থেকে সৃষ্টির সূচনা করি।)
এখানে একটা কথা মনে পড়ে। খৃস্টপূর্ব ৬২৪Ñ৫৬৫ অব্দে গ্রীক বৈজ্ঞানিক থিলিস অব মিলিটুন পানিই সৃষ্টি মূল উপাদান তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। ইবনে সিনা বলছেনÑমাটির উৎপত্তিও পানি থেকে। কারণ পানিতে মৃত্তিকা গুণ বেশী। পানি ক্রমশ জমাট হয়ে কাদায় পরিণত হয়। কাদা থেকে মাটি, পাহাড়-পর্বত, গাছ-পালা ইত্যাদি গড়ে উঠে। ইবনে হাইয়ান বলেন, ধাতুর উৎপত্তির মূলে পানি নয়, বাষ্প।
সৃষ্টিতত্ত্বের মূলে মিলিটুস বলেনÑপানি এবং ইবনে সিনাও বলেন পানি।
ইবনে হাইয়ান বলেনÑসব ধাতুর সৃষ্টির মূলে রয়েছে বাষ্প। (বাস্প মূলতঃ পানরিই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্রাংশ মাত্র।)
বাষ্প মানেই আত্মা (রূহ)। অর্থাৎ সবই আল্লাহ্র শক্তি বা নূর।
পাতন (ফরংঃরষষধঃরড়হ), উর্ধ্ব পাতন (ঝঁনষবসধঃরড়হ), পরি¯্রাবণ (ঋরষঃৎধঃরড়হ), দ্রবণ (ঝড়ষঁঃরড়হ)
(হাতের লেখা) রসূল সাঃ ইহুদী পন্ডিত আবদুল্লাহ ইবনে সালামের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, মাটি সমূদ্রের ফেনা থেকে উৎপন্ন। (সমূদ্রের ফেনা থেকে কাদা, কাদা পানি থেকে উৎপন্ন)
খালিদ ইবনে ইয়াযিদের রাজকীয় ল্যাবরেটরী।
স্বর্ণ তাল প্রাপ্ত স্থানটি জাবির ইবনে হাইয়ানের ল্যাবরেটরীও হতে পারে না। খুব সম্ভব এটি খালিদ ইবনে ইয়াযিদের রাজকীয় ল্যাবরেটরী। উমাইয়াদের দেশের পর দেশ বিজয়ে চিরদরিদ্র আরবদের পিছনে যে অজ¯্র অর্থ ব্যয় হয়েছিল, এর রহস্য মূলে ছিল হয়ত খালিদের স্বর্ণ প্রস্তুতের অক্লান্ত প্রচেষ্টা। খালিদের প্রস্তুত স্বর্ণ দিয়েই হয়ত উমাইয়াদের বিজয়ের অভিযান অব্যাহত ছিল। এই স্বর্ণ তালটি হয়ত তাঁর রাজকীয় ল্যাবরেটরীর গোপন সংরক্ষণাগারে সঞ্চিত ছিল। রাজভা-ারে চালান দেওয়ার পূর্বেই হয়ত খালিদ মৃত্যুবরণ করেন। (হাতের লেখা) রাজ্যের পর রাজ্য দখল করে তার শাসন কার্য নির্বাহের জন্য জরুরী প্রয়োজন হয় অর্থের। ইউরোপ বাংলাকে বেছে নিয়েছিল আমেরিকাকে স্বাধীনতা দিয়ে অর্থনৈতিক বিবেচনায়। (স্বর্ণে তাল খালিদ ইবনে ইয়াজিদের বাস ভবনে ?)
(২৩২)
খালিদের মৃত্যুর পরেও উমাইয়া শাসন ৪৬ বছর টিকেছিল।
খালিদের মৃত্যুর পরেও উমাইয়া শাসন ৪৬ বছর টিকেছিল। এই শাসনের পেছনে যদি রাসায়নিক স্বর্ণ ভা-ার না-ই থাকবে, তাহলে খলীফা আবদুল মালিক ও খলীফা ওয়ালিদের সময় এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপÑএই তিনটি মহাদেশ ব্যাপী সা¤্রাজ্যের বিস্ময়কর সম্প্রসারণ লাভ কিভাবে সম্ভব হয়েছিল এবং এর পরবর্তী উমাইয়া বিজয় অভিযানেই বা কেন মন্দাগতি দেখা দিয়েছিল ?
উমাইয়া শাসনামলে পশ্চিম ভারত হতে আরম্ভ করে ভারত মহাসাগর ও ভুমধ্যসাগর চীন সীমান্ত হয়ে বর্তমান সোভিয়েত ইউনিয়নের ছয়টি রাজ্য স্পেন সহ ইউরোপের কতকাংশ নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরাঞ্চল হয়ে সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশকে নিয়ে বিশাল সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।
‘তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ স¤্রাট’ বলে অভিহিত করেন। বিশ্বব্যাপী এই বিশাল সা¤্রাজ্য সম্প্রসারণে তারিক, মুসা, ইবনে কাসিম, হাজ্জাজ প্রমূখ সময়-বিজ্ঞানের যুগ¯্রষ্টা ও রণকুশলী সেনাপতির স্মরণীয়রণ অবদানই শুধু ছিল না, ছিল খালিদের স্বর্ণ তাল প্রস্তুতের সকল প্রয়াস অর্থাৎ হযরত আলী (রা)-র বাণীর সার্থক বাস্তবায়ন।
gymwjg mf¨Zvi Gme n‡jv fwel¨Z D¾¡j Avwac‡Z¨i Aa¨vZ¥ m~‡Îi Bw½Z| Avjøvn&i Avw` m„wó Aa¨vZ¥ev`x gnvÁvbx nhiZ Avjx (iv)-i gvidZ ¯^Y© cÖ¯‘‡Zi cÖYvjxwU
(২৩৪) পদার্থ বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান
কেলাসন(ঈৎুংঃধষরংধঃরড়হ),ভস্মীকরণ(ঈধষপরহধঃরড়হ),গলন(গবষঃরড়হ),বাষ্পীভবন (ঊাধঢ়ড়ৎধঃরড়হ) ইত্যাদি রাসায়নিক সংশ্লেষণ বা অনুশীলন গবেষণার কি কি রূপান্তর হয় এবং তার বাস্তব ফল কি, ইবনে হাইয়ান তাও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে গেছেন।
ইবনে হাইয়ান ইস্পাত প্রস্তুত করার পদ্ধতি, চামড়া ও কাপড়ে রং করবার প্রণালী, লোহা এবং ওয়াটার প্রুফ কাপড়ে বার্নিশ করার উপায়, কাঁচ তৈয়ার করবার জন্য ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অকসাইডের ব্যবহার, সোনার জলে পুস্তকে নাম লেখবার জন্য লৌহের ব্যবহার ইত্যাদিও ব্যবহার করেন। তিনিই আর্সেনিক ও এন্টিমনি আবিস্কার করেন।
অন্য ধাতুর সঙ্গে মিশ্র স্বর্ণকে ঈঁঢ়বষষধঃরড়হ পদ্ধতিতে অর্থাৎ মীগার সঙ্গে মিশিয়ে স্বর্ণ বিশুদ্ধ করার পদ্ধতি তিনি আবিষ্কার করেন। তিনিই আলকালিতে দ্রব করে নিয়ে পরে ভিনেগারে অধঃক্ষেপ করে গন্ধককে বিশুদ্ধ করার পন্থা আবিষ্কার করেন।
ইবনে হাইয়ানই সর্বপ্রথম নাইট্রিক এসিড আবিষ্কার করেন। তাঁর কিতাবুল ইসতিতমাস’ নাইট্রিক এসিড প্রস্তুতের ফরমূলা রয়েছে ঃ
আধসের পরিমাণ সাইপ্রাসের মাজাত (ঠরঃৎরধষ) নাও। এর সঙ্গে একসের পরিমাণ সল্ট পিটার এবং সিকিটাক আন্দাজ ইয়েমেনের ফিটকিরি নাও। এগুলোকে একসঙ্গে করে একত্রে একটি পাত্রে খুব জাল দিতে থাক। যতক্ষণ তা পাত্রে এলেমবিক লাল হয়ে যায়। এই বার উদ্ভূত তরল পদার্থটিকে বের করে নাও। এ প্রায় সমস্ত জিনিসকেই দ্রব করে। বৈজ্ঞানিক এর নাম দিয়েছেন ‘মাআললুলাল’ বা দ্রাবক জল। এই তরল পদার্থটিই নাইট্রিক এসিড।’১
সিলভার নাইট্রেক, পারদের সঙ্গে ‘হাইড্রোক্লোরিক’ এসিড সংমিশ্রণে উদ্ভূত মারকিউরিক ক্লোরাইড ও তাঁর আবিষ্কৃত দ্রবগুলোর অন্যতম। সালফিউরিক এসিডও তাঁর আবিষ্কার।
নাইট্রিক এসিডে স্বর্ণ গলে না। নাইট্রিক এসিড ও হাইড্রোক্লোরিক এসিড সংমিশ্রণে স্বর্ণ গলানোর ফরমূলা তিনি আবিষ্কার করেন।
(২৩৫)
বিশুদ্ধ সোনালী রং-এর গন্ধক ও বিশুদ্ধ পারদ একত্রিত করে জমিয়ে কঠিন করলেই স্বর্ণ পরিণত হয়।
একটি গোলাকার কাঁচের পাত্রে কিছুটা পারদও একটি সিরিয়ান মাটির পাত্রের ভিতরে বসিয়ে, মাটির পাত্রের ভিতর কাঁচের পাত্রটির চারদিকে গন্ধকের গুঁড়ো দিয়ে ভালোমতো ভর্তি করে, মাটির পাত্রটির মুখ উত্তমরূপে বন্ধ করে দিয়ে, একরাত জ্বাল দিয়ে, পারদটি রক্ত বর্ণের কার্বন পদার্থে পরিণত হয়। এই তাজা রক্তের মত লাল টুকটুকে কঠিন পদার্থটিই রক্তপারা অভিহিত।
ইবনে হাইয়ান চিকিৎসাশাস্ত্র, ইউক্লিড ও আল-মাজেস্টের, ভাষ্য দর্শন, যুদ্ধবিদ্যা, জ্যোতিবিজ্ঞান, রসায়ন ও কাব্য সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
তিনি এপোলোনিয়ামের আধ্যাত্মিকবাদ, প্লেটো, সক্রেটিস, এরিস্টটল, পিথাগোরাস, ডিমোক্রিটাস প্রমুখের গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং গ্রীক ভাষায় সুপ-িত ছিলেন।
ইবনে হাইয়ানের মতে সব ধাতুই যখন পারদ আর গন্ধক দ্বারা সৃষ্টি হয়, তাহলে রাসায়নিকদের কাজ হলো যাতে যে জিনিসটির অভাব, তা পূরণ করে দেওয়া এবং উদ্বৃত্ত জিনিস বের করে দেওয়া। এজন্য প্রয়োজন তাগিত তাগলিস, তাকতির, তাহালিল প্রভৃতি প্রক্রিয়ার এবং এর কার্যকরী কর্মকর্তা হলো লবণ, ফিটকিরি, ভিট্রিওল, বোরাক্স, ভিনেগার ও
আল বরিুনী অধ্যায়রে পর পষ্টেংি করুন। ৭/৬/২০২৬ সময়ঃ ৪ঃ৪৩ মনিটি বকিাল
৩ হাজার বছর পূর্বে ব্যাবিলনীয়রা ‘কুইনী ফরম’ নামক এক ধরনের ছাপা যন্ত্র ব্যবহার করতেন। অন্ততঃ চীন যে পঞ্চদশ শতাব্দীর বহু পূর্বে উন্নত ছাপাখানার আবিষ্কারক একথা বিশ্ববিদিত। সুতরাং গুটেনবার্গ ছাপাখানার প্রথম আবিষ্কারক নন। ১৫৯২ খৃস্টাব্দে থারমোমিটার ও ১৬০৯ খৃস্টাব্দে টেলিস্কোপ যে গ্যালিলিও আবিষ্কার করলেন, তারও পূর্ববর্তীকালে এসবের কোন আবিষ্কারক ছিলেন কিনা-অনুসন্ধিৎসুদের খুঁজে দেখা দরকার। ১৯০৩ খৃস্টাব্দে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের উড়োজাহাজ আবিষ্কারের ১০১৫ বছর পূর্বে ৮৮৮ খৃস্টাব্দে বিন ফিরনিস উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেন।
(১১১)
দূরবীক্ষণের আধুনিক আবিষ্কর্তা গ্যালিলিও জম্মের ৭৩১ বছর পূর্বে আবুল হাসান দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন।
আধুনিক ইউরোপীয় আবিষ্কারকদের বহু শত বছর পূর্বে আরব, মোগল ও পাঠানেরা গোলা-বারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র আবিষ্কার করেন।
নৌবাহনিী
‘নৌবহর’ শব্দটাই আরবদের। আরবী অর্থে ‘বহর’ অর্থ সমুদ্র বা সামুদ্রিক জাহাজ। ‘মাল্লা’ আরবী শব্দ। অর্থ নাবিক। ‘নাও’ আরবী শব্দ। অর্থ নৌকা। ‘দাড়ি’ নৌচালক, আরবী শব্দ। ‘বন্দর’ ফারসী শব্দ। এ-ও মুসলিম সভ্যতারই অবদান। তারপর আরবরা যাকে বলত ‘আমিরুল বহর’ পুর্তগালরা তাঁকে বলত ‘আমিরাহ’ ফরাসীরা বলত ‘আমিরাল’ ইংরেজরা বলত ‘অ্যাডমিরাল’। এসব শব্দ আবিষ্কারেও আরবরা অগ্রনায়ক। কুরআনেও জাহাজের উল্লেখ রয়েছে।১ ‘৪৯ হিজরীতে রোমানরা যখন সিরিয়ার উপকূল আক্রমণ করেন,তখন মিসরে একটি জাহাজ নির্মাণের কারখানা ছিল। হযরত মাবিয়া দামিশকেও আর একটি জাহাজ নির্মাণের কারখানা স্থাপন করেন। তিনি আরব নৌবহরের সাহায্যে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপগুলো দখল করে নেন। খলীফা আবদুল মালেক তিউনিসে একটি বিশাল জাহাজ নির্মাণ কারখানা স্থাপন করেন।২
উপকূল এলাকা বারবুদ দখল করে।৩
১. ‘আল-কুরআন ঃ ২৮ নং সুরায় জাহাজ সম্বন্ধে উল্লেখ আছে।
২. আল মুকাদ্দামা ঃ ইবনে খালদূন, পৃষ্ঠা ২১০।
৩. আল-মুকাদ্দামা ঃ ইবনে খালদূন, ৩য় খ-, পৃষ্ঠা ২০৮।
(১১২) তুরস্ক
৬৬৯ খৃস্টাব্দে হযরত মাবিয়ার যুদ্ধ জাহাজগুলো নৌবহর) সাফল্যের সঙ্গে কনস্টান্টিনোপল আক্রমণ করে।১
মুসলিম বিজ্ঞান সভ্যতার পতন যুগ
১৪৯২ খৃস্টাব্দে স্পেনে আরব সভ্যতার পতনের ভিত্তির উপরই ইউরোপের জাগরণ যুগ শুরু হয়। অন্যদিকে মুসলমানগণ হীনবল হতে শুরু করে। যদিও ১৫১২ খৃস্টাব্দে সেলিম তুরস্কের খলীফা পদে সমাসীন হয়ে ১৫১৭ খৃস্টাব্দে মিসরকে তুরস্ক সা¤্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। এবং ভারতে ১৫২৬ খৃস্টাব্দে বাবরের দিল্লী দখল ও মোগল সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠার গৌরবময় যুগের সূচনা হয়।
ইয়াযীদের পুত্র খালিদ রাজত্ব ছেড়ে বিজ্ঞান সাধনা
হযরত আলী ও ইবনে সিনা প্রমুখের গন্ধক নিয়ে এত বাক্য ব্যয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা না হয় বাদ দিলাম, আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের সর্বজনস্বীকৃত জনক জাবির ইবনে হাইয়ানও কি গন্ধকের ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় সৃষ্টি বারুদ সম্বন্ধে কিছুই বুঝতেন না ? এতদূর যেতে হয় না। কারবালার ঘাতক খলীফা ইয়াযীদের পুত্র রসায়ন বিজ্ঞানী খালিদ রাজত্ব ছেড়ে দিয়ে আজীবন বিজ্ঞান-সাধনায় কাটিয়ে দিতে গিয়ে স্বর্ণ প্রস্তুত পর্যন্ত এগিয়ে যেতে পারলেন, শুধু গন্ধক দ্বরা বারুদ প্রস্তুতের কথাটাই তাঁর মনে ছিল না।
১. বাংলাদেশ ও বিশ্বের ডায়েরী ঃ অধ্যক্ষ কে, এ, রহমান, পৃষ্ঠা ১৬১।
২. মুসলিম রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা ঃ পৃষ্ঠা ২৭১।
(১১৩) অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপেছিল অন্ধকার যুগ (হাতের লেখা)
অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপর ছিল সম্পূর্ণ অমানিশার অন্ধকার যুগ। আর আরব সভ্যতার ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকোজ্জ্বল যুগ। আরব সভ্যতার ইতিহাসের প্রায় সবগুলো পাতাই তাদের কালি দিয়ে ঢেকে ও বেনামী করেও তারা যেন তৃপÍ নয়, সন্তুষ্টও নয়।
(১১৪) চীন
পরে মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের একাদশ দ্বাদশ শতাব্দীর বিজ্ঞান পুস্তকসমূহ ক্রমান্বয়ে পরিপক্কতা লাভ করে।
চীনের বীজগণিত ও ত্রিকোনমিতি প্রভৃতিতে আরবদের সংখ্যা বিজ্ঞানের প্রতিফলন ঘটে।
১২৫৮ খৃস্টাব্দে মঙ্গোল স¤্রাট মাঞো খানের নির্দেশে হালাকু খান বাগদাদ দখল করেন। এরপর নাসিরুদ্দীন তুসীর সহায়তায় হালাকু খান মারাঘার মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই মানমন্দিরে তুসীর অধীনে কয়েকজন চীনা বৈজ্ঞানিকও কাজ করতেন। ওঁদের দ্বারা বা কুশো চিং-এর আরব অনুকরণীয় ত্রিকোনমিতি থেকে চীনদেশ প্রভাবিত হয়।
ষোড়শ শতকে অধ্যাপক রাসুম নামক খৃস্টান বিজ্ঞানী ইবনুল হায়সামের ‘কিতাবুল মানাজির-এর পা-ুলিপি মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের আনাচে-কানাচে খুঁজে হয়রান হয়ে অবশেষে এক দোকানদারের পুটলি বাঁধার ছেঁড়ে কাগজের মধ্যে খুঁজে পান।
(১১৫) জ্ঞানী জ্ঞানীকেই ভালবাসে
এতে তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন। মধ্যপ্রাচ্যে যখন মুসলিম য়াহূদীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ উত্তেজনা চলছে, তখনও য়াহূদী বৈজ্ঞানিক মার্টিলেভী আরব বৈজ্ঞানিকদের বহু পা-ুলিপি পাওয়া যায় না বলে মর্মাহত হয়েছেন, জ্ঞানী জ্ঞানকেই ভালবাসেন।
১)ইউরোপে মুসলিম জ্ঞান বিজ্ঞানের ধ্বংসযজ্ঞ (হাতের লেখা)
১৪৯২ খৃস্টাব্দে স্পেনে মুসলমানদের পরাজিত করে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নিয়ে এই বছরই স¤্রাট ফার্টিনা- রানী ইসাবেলাকে বিবাহ করেন। ইসাবেলার গুরু জিমনজেজর পরামর্শে রানী ইসাবেলা মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বইগুলো অগ্নিদগ্ধ করেন। মুসলমানদের আরবী ভাষা ও বই-পুস্তক স্পেনের রাজাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
(২) মুসলমানদের বিজ্ঞান বিরোধিতা উভয়ের পরিণত মুসলমানদের বৈজ্ঞানিক পতন যা থেকে ইউরোপীয় বিজ্ঞান প্রযুক্তির উত্থান (হাতের লেখা)
হালাকু খাঁ বাগদাদ ধ্বংস করে জ্ঞান গ্রন্থগুলো দজলা নদীতে ডুবিয়ে দেন। ভারত থেকে পারস্য পর্যন্ত পারসিক লুপ্ত সভ্যতার প্রভাবিত মুসলমানরাও বিজ্ঞানের ভাষা আরবীকে বাদ দিয়ে তদস্থলে ফারসীকে রাজভাষা করেন।
‘আল্লাহ্ তা’আলার প্রকৃতির অবস্থা ও তাঁহার সৃষ্টিতত্ব জানা’ ধর্মবিরোধী বলে তিনি প্রচার করেন। অথচ আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টিকে জানার জন্যেই মানবজাতি সৃষ্টি করেছিলেন বলে তিইি বারবার কুরআনের উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন। এই শ্রেণীর প্রচারের ফলে বাগদাদ মসজিদের ইমাম, ইবনুল হায়ল সামের বিজ্ঞান গ্রন্থ সংগ্রহ করে গ্রন্থের প্রত্যেকটি পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে প্রকাশ্য রাজপথে অগ্নিদগ্ধ করা হয়েছিল।
মুসলমানদের এই পতন ও গোড়ামীর যুগে ইউরোপীয়রা মুসলমানদের বিজ্ঞান গ্রন্থগুলো অনুবাদ করে জ্ঞান সঞ্চয় করা শুরু করেন। অন্য দিকে আরব প্রতিভা গুলোকে বিজ্ঞান-বিমুখ গোড়া করে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন চক্রান্ত শুরু করে দেয়। এই ধরনের বহু মোল্লাই জানা-অজানায় ইউরোপীয় ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হয়ে ক্রীড়নকে পর্যবসিত হন।
(১১৬)
খলীফা হারুনুর-রশীদের স্ত্রী জুবায়দার গোরস্থান থ্কার জন্যও বিশেষ ভাবে প্রসিদ্ধ। খলীফা আবদুল্লাহ্র মন্ত্রী খালাফ ফখরুল মুলকের উৎসাহেই হয়ত আল-কারখী বিজ্ঞান গবেষণার সুযোগ পেয়েছিলেন। কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ তাঁর বীজগণিত গ্রন্থটির নাম রাখেন ‘আল-ফাখরি’। তাঁর জীবন সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানা যায় না। ব্রকলম্যান তাঁর ৪ খানা গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা ঃ
১. আল-কফিফিল হিসাব, ২. কিতাবুল কাখরি, ৩. কিতাবুল ইনবাত আলমিয়া আল-খফিয়া, ৪. আল বদিফিল হিসাব। এই ৪টি গ্রন্থের মধ্যে মাত্র আল-কাফিফিল হিসাব ও আল-ফাখরি এই দুটি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। তাও মূল আরবী নয়। বাকীগুলোর খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি।
জার্মান
এ হোচিয়েন নামক জনৈক জার্মান পন্ডিত ১৮৭৮ খৃস্টাব্দে আল-কাফিফিল হিসাব-এর জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে ৩ খ-ে প্রকাশ করেন। সঁনিয়ে এফ উপেক প্যারিস থেকে ১৮৫৩ খৃস্টাব্দে ‘আল-ফাখরি’-র একটি সংক্ষিপ্ত অনুবাদ প্রকাশ করেন।
অংক
আল-কারখের ‘আল কাফিফিল হিসাব’ অঙ্কশাস্ত্রের বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এতে অঙ্কের বিভিন্ন উদাহরণ সন্নিবেশ করে নিজের উদ্ভাবিত পন্থাগুলোও যোগ করা হয়েছে। এই নব উদ্ভবিত পন্থাগুলোই কারখের অসাধারণত্বের পরিচয় দেয়। তিনি অঙ্কের সহজতর স্তর থেকে ক্রমশ জটিলতার দিকে এগিয়ে যান এবং অঙ্কের সাথে বীজগণিতের সংমিশ্রণ ঘটান।
ভারতীয় সংখ্যা বিহীন
আবু ওয়াফার ন্যায় কারখিও কোথাও ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করেন নি। সব সংখ্যা ও অঙ্ক অক্ষরে ব্যবহার করেন। এ সভ্য বিস্ময়কর সৃজনী প্রতিভা। ভারতীয় ও গ্রীক সংখ্যাবিজ্ঞান সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আল-কারখি অঙ্কশাস্ত্রে নিজস্ব সৃজনী শক্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। এ তাঁর সৃজনী প্রতিভারই পরিচায়ক।
সব সংখ্যা ও অঙ্ক অক্ষরে ব্যবহার করেন আবল জুদ (হতের লেখা)
(১১৭)
তিনিই সর্বপ্রথম একটি সমীকরণের সমাধান দ্বারা সুষম সপ্তভুজের বাহুর পরিমাণ নির্ধারণ করেন।
জুয়াইন নৃপতি
ফখর-উদ-দৌলার উৎসাহে তিনি বিজ্ঞান সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। ঝবীঃধহঃ নামক সূর্যের উচ্চতার পরিমাপক যে যন্ত্র আবিষ্কার করেন, শাসকে প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসাবে যন্ত্রের নাম রাখেন ‘আস সুদ আল ফাখরী’। এই যন্ত্রের দ্বারা সূর্যের উচ্চতা ঠিক করা হয়েছিল। ৯৯৪ খৃস্টাব্দে এই ঝবীঃধহঃ দ্বারাই রাইতে আল-খুজান্দি সূর্যের উচ্চতা নির্ণয় করেন। অসাধারণ পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফলে এই জটিল সমস্যার সমাধানে তিনি কৃতকার্য হন। সূর্যের উচ্চতা নির্ণয় সাপেক্ষে তিনি গ্রন্থও প্রণয়ন করেন।
মুসলিম বিজ্ঞান পুনজাগরণে আল-খুজান্দির ভূমিকা (হাতের লেখা)
এ ছাড়া ‘আল আলা-আস সামিলা’ নামে তিনি আর একটি যন্ত্রও আবিষ্কার করেন। এদ্বারা আস্তরলব ও কোয়াড্রান্টÑউভয়েরই কাজ চলত। প্রথমে এই যন্ত্রটিকে শুধু একই অক্ষরেখাতে ব্যবহার করা হতো। পরে আল-আস্তরলবী একে সমস্ত অক্ষরেখাতেই ব্যবহার উপযোগী করে তোলেন। খুজান্দির অসাধারণ বিজ্ঞান সাধনা ও অভিনব যন্ত্রাবিষ্কারের ফলে কিছুটা স্তিমিত মুসলিম বিজ্ঞান জগতে নব প্রেরণার সঞ্চার করে।
ইউরোপ
ত্রিকোনমিতিতেও তাঁর দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। মিঃ +, মিঃ মারটন প্রমুখ পাশ্চাত্য প-িত তাঁর আবিষ্কার ও গবেষণা এনিয়ে আলোচনা করেন। মিঃ ব্রফ্লম্যান তাঁর ৪টি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেন।
(১১৮)
১টি হলো জ্যামিতি সম্বন্ধে। এর আরবী নাম জানা যায় না অন্য ৩টি হলো ঃ ১. ‘কিতাবুল আলা আস-শামিলা’ ২. রিসালাতুন ফি তাসহিহ আল-মালায়েল’... ...৩ ফি আমালি আল-আলা আল আম্মাতে’।
ইউরোপীয় বিজ্ঞানের ইসলামী করণ (হাতের লেখা)
খাওয়ারিজমের রাজবংশ শাহ মুহাম্মাদ বিন ইরাকের পিতৃব্য পুত্র। তিনি বিশ্ববরোণ্য প-িত আল-বেরুনীর শিক্ষক। তিনি ১০০৭Ñ৮ খৃস্টাব্দে ম্যানিলসের ঝঢ়যবৎরপধ-কে নানাভাবে সংশোধিত করে এর একটি উন্নত সংস্করণ প্রকাশ করেন। ত্রিকোনমিতি, টলেমির আল-মাজেস্ট, জ্যোতিবিজ্ঞান ও যন্ত্রপাতি নম্বন্ধে কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। বৈজ্ঞানিক ম্যানিলসের প্রণালীকে পরিহার করে, মন্ডলাকার ত্রিভুজের সঙ্গে সাইন প্রভৃতির সম্বন্ধ প্রথম কে স্থাপন করেন,
আরব গণিত বিজ্ঞানের বিশেষ আবিষ্কার (হাতের লেখা)
নাসির তুসী তাঁর ‘আশ শাফ কুল বাত্তা’ গ্রন্থে বলেছেন ঃ আল-বেরুনী উল্লেখ করেন এই সুম্মানের অধিকারী হচ্ছেন আমির আবু নাসির। ইটালীয় প্রাচ্যতত্ত্ববিদ ঈ অ. ঘধষষরহ এই আবিষ্কারকে আরবদের গণিত বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষ আবিষ্কার বলে উল্লেখ করেন।
আল-বেরুনীর পরে তাঁর ১২টি গ্রন্থের কথা উল্লেখ আছে। ব্রকলম্যান তাঁর ১৮টি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করে ১৫টি গ্রন্থের আরবী নামের তালিকা প্রকাশ করেন।
দশমিক ভগ্নাংশ
তখন দশমিক ভগ্নাংশ আবিষ্কার হলেও তা তত সমাদৃত ছিল না। তা ছিল এলোমেলো, কোন সুনির্দিষ্ট প্রণালী ছিল না। তিনিই সর্বপ্রথম ষষ্ঠ ভিত্তিক গণনার পরিবর্তে দশমিক ভগ্নাংশের ব্যবহার প্রচলন করে বৈজ্ঞানিক জগতে সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি ১৭৩ ডিক্রীর বর্গমুল বের করতে যে ভাবে দশমিক ভগ্নাংশ ব্যবহার করেছেন, এদ্বারা
(ঘ) (৪)
(হাতের লেখা) বিশ্ব সভ্যতায় মুসলিম অবদান নূরুল হোসেন খোন্দকার ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ঢাকা
ইফাবা প্রকাশনা ঃ ১৫৭৪ ১৫৭৪
ইফাবা গ্রন্থাগার ঃ ২৯৭.০৯ ২৯৭.০৯
প্রথম প্রকাশ ঃ আষাঢ় ১ঔ ৫ ১৩৯৫, জিলকদ ১৪০৮, জুলাই ১৯৮৮ ১৯৮৮
জবপবরাবফ ভৎড়স জষু পড়ষড়হু ঔধসব গধংলরফ ২৯-৬-১৮ ঔঁসসধনধৎ
মোতাবেক ১৪ই শাওয়াল ১৪৩৯ ১৪৩৯
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
তাঁর আমল পর্যন্ত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেনি। শুধু নৃপতিদের দরবারকক্ষ ও রুচির উপরই জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা নির্ভরশীল ছিল।
সুলতান মাহমুদ
সুযোগে তাঁদের সা¤্রাজ্যের মধ্যে বহু স্বাধীন রাজবংশের আবির্ভাব ঘটে। এতে আরবী এবং পারসী সভ্যতা ও সংস্কৃতি ইসলামের প্লাবনে যদিও একাকার হয়ে গিয়েছিল, তবু এই দুটি সর্ব প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সভ্যতা একত্রীভূত সভ্যতার অভ্যন্তরে ফল্গু¯্রােতের মতো একটি নিয়মিত অন্তর্দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। উম্মিয়া আব্বাসীয়দের মধ্যে যত ঝগড়া-বিরোধই থাক, উভয় বংশের শাসকগণই পারসিকদের বাঁকা চোখেই দেখতেন। আব্বাসীয়দের
পতন যুগে পারসিক আধিপত্য বৃদ্ধির ফলেই বুয়াইদ বংশের অভ্যুত্থান ঘটে। আব্বাসীয় বংশের দুর্বলতার সুযোগে খাওয়ারিজমী প্রদেশের দুইজন সুলতান মস্তকোত্তলন করেন। এর উত্তরাংশের সুলতান হলেন মামুন বিন মাহমুদ, দক্ষিণাংশের আল-ইয়াতী বংশের সুলতান আশ্রয়পুষ্ট ছিলেন আল-বেরুনী ৯৯৪-৯৫ খৃস্টাব্দে মামুন বিন মাহমুদ আবদুল্লাহ্কে হত্যা করে তাঁর রাজ্য দখল করে নিয়ে নিজকে খাওয়ারিজমের স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করেন। এই রাজনৈতিক বিপর্যয়ে আল-বেরুনী জম্ম ভূমি ত্যাগ করে জুরজানে চলে যান। নিঃস্ব ও নিঃসহায় অবস্থায় যখন জুরজানের রাস্তায় ঘুরে বেড়ান, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২২ বছর। অভাব-অভিষোগের কারণে দুর্দশাগ্রস্ত, মানুষের প্রতি গণ্যমান্য মানুষেরা যে অপমানজনক ব্যবহার করতেন, এতে মর্মাহত হয়ে তিনি মানুষের দারিদ্র জীবন সম্বন্ধে মন্তব্য করেন যে, “দারিদ্র্য মানুষের গুণকেও দোষ পরিণত করে” এই অবস্থায়ও এই সময়ে তাঁর জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুখ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
শীঘ্রই তিনি জুরজানের সুলতান কাবুসের সুনজরে পড়েন এবং এই বিদ্যুৎসাহী সুলতানের বন্ধুতে পরিণত হন। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ সদ্য লিখিত ‘আল আছারুল বাকিয়া’ ও ‘তাজরী দুশ শুয়াত’ নামক দুটি মূল্যবান পুস্তক তিনি কাবুসের নামে উৎসর্গ করেন। তবু তাঁর তরুণ মন জম্মভূমি খাওয়ারিজমের প্রতি আকৃষ্ট ছিল।
খাওয়ারিজমের সুলতান মামুন বিন মাহমুদও একান্ত বিদ্যুৎসাহী ছিলেন। তিনি স্বদেশত্যাগী আল-বেরুনীর গুণগান শুনে মুগ্ধ হয়ে ৪০০ হিজরীতে দেশে ফিরে আসার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। আল-বেরুনী সানন্দে এই রাজকীয় আহবানে সাড়া দিয়ে দেশে ফিরে আসেন।
দেশে ফিরে এসে প্রকৃতপক্ষে তিনি সুলতান মামুনের প্রধান মন্ত্রীরূপেই কাজ করতেন এবং মানমন্দির স্থাপন করে জ্যোতিবিজ্ঞানে পর্যবেক্ষণ কার্য চালনা করতেন। ৭ বছর শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের পর গযনীর দিগি¦জয়ী সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজমের সুলতানের নিকট একটি রাজকীয় পত্র দ্বারা মর্যাদানুকুল মার্জিত ভাষায় পরেক্ষ আদেশ করেন খাওয়ারিজমী সুলতানের দরবারে প-িতম-লীকে গযনীতে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য।
আলÑবেরুনী
আলÑবেরুনী তাঁর দু’এক জন প-িত ব্যক্তি সঙ্গী নিয়ে সুলতান মাহমুদের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে গযনীতে ১০১৬ খৃষ্টাব্দে চলে আসেন এবং মামুনের দরবারের অন্যতম বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আবু আলী ইবনে সিনা এই অমর্যাদাকর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দু’এক জন বৈজ্ঞানিক সঙ্গী নিয়ে গষনীর সুলতান মাহমুদের ভয়ে খাওয়ারিজমের রাজ্য ছেড়ে পলায়ন করেন।
(১২২)
ইবনে সিনার বিদ্রোহের অজুহাতে সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম রাজ্য দখল করেন, মামুন বিন মাহমুদকে হত্যা করেন।
আল-বেরুনীর পা-িত্যে সুলতান মাহমুদ মুগ্ধ থাকলেও খায়ারিজম রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থাকায় তাঁর প্রতি সুলতান মাহমুদের দৃষ্টি চিরকাল বাঁকা ছিল।
“মাহমুদ আমাকে অনুগ্রহ করতে কার্পণ্য করতেন না। তিনি আমাকে প্রচুর ধন দান করেছেন, যথেষ্ট প্রশ্রয় দিযেছেন, আমার অজ্ঞতা ক্ষমা করেছেন, প্রচুর সম্মান করেছেন এবং মর্যাদা দানে আমার গৌরব ও পোশাক উজ্জ্বল করেছেন।”১
আল বরিুনী অধ্যায়রে পর পষ্টেংি করুন। ৭/৬/২০২৬ সময়ঃ ৪ঃ৪৩ মনিটি বকিাল
ক্ষেত্র সৃষ্টি করেন। তিনি সাবিত ইবনে কোরার আদর্শ অনুসরণে জ্যামিতির প্রতিপাদ্য ও উপপাদ্যের মীমাংসায় সমীকরণ প্রয়োগ করেন। বিশেষভাবে সমীকরণের সাহায্যে জ্যামিতির সমস্যাগুলোর সমাধান করেন। এভাবে সমীকরণের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করে জ্যামিতিক মীমাংসা সম্ভব করাই ছিল তাঁর নিজস্ব অবদান। এজন্যে তাঁকে দশম শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শুদ্ধ অঙ্কশাস্ত্রবিদ বলা চলে। অঙ্কের এই দুই শাখায় তিনি অনেকগুলো গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। অঙ্কের সাঙ্কেতিক নিয়মগুলো আবিষ্কার।
(১০৯)
ইয়াহূদী বৈজ্ঞানিক। তিনি এই সময় কায়রোর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষালাভ করে, পরে ব্যাবিলনে বিজ্ঞান শিক্ষাদানে রত হন।
আধুনিক বিজ্ঞানও প্রযুক্তি -
আবু কামিল, সাবিত ইবনে কোরা প্রমুখ বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের অঙ্ক-প্রত্যঙ্গকে নিত্য নতুন
আবিষ্কার-অবদান দিয়ে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষ তাদের সেই বিজ্ঞান সাধনারই পরিণতি।
মুসলমানদের আবিষ্কৃত একটি অতি ক্ষুদ্র ‘০’ কে যদি প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে বিজ্ঞানের হৃৎপি- স্তদ্ধ হয়ে যাবে বললে অযৌক্তিক হবে না। একটি ‘০’-এর অভাবে সমগ্র বিজ্ঞান জগতটাই মহা অন্ধকারে ডুবে যাবে। শুধু তাই নয়,
বিজ্ঞানে মুসলিম অবদানের গুরুত্ব -
মুসলিম সভ্যতার সৃষ্ট অবদান যদি একটি একটি করে আধুনিক বিজ্ঞানের বুনিয়াদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে আধুনিক বিজ্ঞান দেউলিয়া হয়ে যাবে। একটি দালান যত প্রকান্ডই হউক, তার ভিত্তি বাদ দিলে যেমন দালানটির অস্তিত্ব থাকে না, তেমনি আধুনিক বিজ্ঞান থেকে মুসলিম অবদান বাদ দিলে আধুনিক বিজ্ঞানের অস্তিত্ব থাকে না।
আল মাক্কারী তাঁর ‘নাফে আত-তিব’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, বিন ফিরনিস নামক জনৈক ব্যক্তি ৮৮৮ খৃস্টাব্দে মানুষ পরিচালিত একটি উড়োজাহাজ নির্মাণ করে আকাশে উড্ডয়ন করে অবতরণকালে মৃত্যুমুখে পতিত হন।১
পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরভিল রাইট ও উইলবার রাইট ভ্রাতৃদ্বয় ১৯০৯ খৃস্টাব্দে উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেছিলেন। আব্বাসীয় খলীফা মুতাওয়াক্কিলের পতনের ২৫ বছর পরে বিন ফিরনিস স্বীয় নির্মিত বিমানযোগে আকাশে উঠেছিলেন। হয়ত সেই বিমানটি অতিশয় অনুন্নত ছিল। কিন্তু আকাশে উড্ডয়নের বৈজ্ঞানিক স্বপ্নটিও আরব বিজ্ঞান থেকেই বিংশ শতাব্দীর
(১১০)
বলা হয় ১২৮৫ খৃস্টাব্দে আলেকজ-ার ডি স্পিনা চশমা আবিষ্কার করেন। অন্যদিকে ত্রয়োদশ শতকের রোজার বেকনকেও চশমা আবিষ্কারক বলা হয়। জার্মানীর গুটেনবার্গ ১৪৪০ খৃস্টাব্দে ছাপাখানা আবিষ্কার করেন। অথচ ঐতিহাসিক মায়ার্শের মতে খৃস্ট জম্মের
চীনা জ্ঞান-বজ্ঞিানরে ইতহিাসঃ ২৪৬ খৃস্টপূর্বাব্দে শি-হোয়াং-টি (পযর-যড়-ধহম-ঞর) চীনের সিংহাসনে আরোহণ করেন। ২১৪ ১ খৃস্টপূর্বাব্দে চীনের মহাপ্রাচীর নির্মানের মধ্য দিয়ে চীনা সভ্যতার নবদিগন্তের সূচনা হয়। পরবর্তী ৪শ’ বছর ধরে এই সভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে অবদান রেখে মানব সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করে। ২২০ খৃস্টাব্দে চীন হ্যান রাজবংশের পতনের পর পরবর্তী ৪শত বছর ব্যাপী গৃহযুদ্ধে খ--বিখ- হয়ে পড়ে! কুওসিনট্যাং সরকার পতনের পর ৭০ হাজার কমিউনে গঠিত মহাচীন আবার তার প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহ্য গৌরবে উদ্দীপ্ত হয়ে জেগে উঠেছে। রোমান সভ্যতা যেমন ১৩৯৬ বছর চলার পর সারা-সিনদের নিকট বিপর্যস্ত হয়ে নয় শতাধিক বছর স্তিমিত থেকে ১৪৯২ খৃস্টাব্দের পর বর্তমান সভ্যতার শীর্ষদেশে গৌরবোদ্দীপ্ত রয়েছে, তেমনি ২৪৬ খৃস্টপূর্বাব্দের পরবর্তী ৪৬৬ বছর পর্যন্ত বিশ্ব সভ্যতাকে চীন সভ্যতা অজ¯্র অবদানে সমৃদ্ধ করে, পরবর্তী শত শত বর্ষ ব্যাপী গৃহযুদ্ধ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণে ল--ভ- ও খ--বিখ- বা পর্যুদস্ত হয়ে এখন পরিস্থিতি আয়াত্তে এনে নিয়ে আবার বিশ্ব সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করার জন্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন।
পারস্য সভ্যতা
৫৩৯ খৃস্টপূর্বাব্দে স¤্রাট সাইরাস পারস্য সা¤্রাজ্য বা পারস্য সভ্যতার গোড়াপত্তন করেন। এই সভ্যতা গ্রীক ও রোমান সভ্যতার মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়েও নিজের অস্তিত্ব ওি বিশ্ব সভ্যতার বিভিন্ন প্রকার অবদান দিয়ে সহায়তা করে আসছিল। পারস্য সভ্যতা জন্ম থেকে ১১৭৬ বছর বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চলার পর সারাসিনদের নিকট ৬৩৭ খৃস্টাব্দে রোমানদের চেছের শোচনীয় ভাবে পরাজয় বরণ করে। রোমান সভ্যতার শুরু হতে শেষ পর্যন্ত বা এখন পর্যন্ত, কোন সময়ই অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়নি। কিন্তু পারস্য সভ্যতা সারাসিন সভ্যতার মধ্যে অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে, বর্ণআগ্রাসনের করাল ৭৫৩ খৃস্টপূর্বাব্দ থেকে রোম সভ্যতা শুরু হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হযরত ঈসার (যীশুখৃস্ট) (আঃ) আবির্ভাবের পর পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলো রোমান সভ্যতার আগ্রাসনের মুখে এসে স্তব্ধ হয়ে যায়।
মুসলিম সভ্যতা
১১৮০ খৃস্টপূর্বাব্দ যদি গ্রীক সভ্যতার গোড়াপত্তনের সমকাল ধরা হয়, তবে তার ৫৬৮ বছর পরে ৬১২ খৃস্টপূর্বাব্দে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ্ (আঃ)-এর আর্বিভাব ঘটে। তাহলে গ্রীক সভ্যতার প্রথম দিকে এবং ব্যবিলনীয় সভ্যতার শেষ দিকে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ্ (আঃ)-এর অসাধারণ প্রভাবের প্রতিফলন হয়েছিল। এমন কি হযরত মুসা (আঃ)-এর লক্ষ লক্ষ য়াহূদী সমর্থকও গ্রীক সভ্যতার নৈরাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিল।
ব্যবলনীয় ও গ্রীক সভ্যতার গোড়ার দিকটি যে দুইজন স্বনামধন্য পয়গাম্বরের আবির্ভাব প্রভাবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল, ওদের ঘোর বিরোধী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ক্ষমতা উন্নত স¤্রাট ফিরাউন নমরূদের নাস্তিক ও নৈরাজ্যবাদ হয়ত বস্তÍবাদী ও নাস্তিকপন্থী গ্রীক দার্শনিকদেরকে উদ্বুদ্ধ ও প্রভাবিত করেছিল। রোমান সভ্যতার অভ্যদয়ের সাড়ে সাত শত বছর পর হযরত
আরব অভিযাত্রীর ভারতে প্রবেশ
৭১২ খৃস্টাব্দে আরব অভিযাত্রীরা ভারতে প্রবেশের পর আর্যদের জ্ঞান-ভা-ারে যা ছিল, তা আহরণে মনোনিবেশ করেন। এইভাবে গ্রীক, রোমান ও পারস্য সভ্যতাগুলোর নিকট হতে অবিরত জ্ঞান আহরণের জন্যে তাঁরা বিশ্বের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন।
বাগদাদের খলীফা হারুনুর-রশিদের নেতৃত্বে সারাসিন সভ্যতা খাইবার পাস-এর স্থলপথেই ভারতে প্রবেশ করে। এই সভ্যতা চট্টগ্রামের নৌপথেও বাংলায় প্রবেশ করার প্রমাণ আছে। ৮০৯ খৃস্টাব্দে খলীফা হারুনুর-রশিদের মৃত্যু হয়। কিন্তু আরব সভ্যতার বিজয় অভিযান অব্যাহত থাকে।
অষ্টম শতাব্দী থেকে তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনা শুরু হয়
একথা সত্য নয় যে, আরবরা সপ্তম শতাব্দীর শুরু থেকে অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন, বিজ্ঞান সাধনায় মনোযোগ দিতে পারেননি বরং অষ্টম শতাব্দী থেকে তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনা শুরু হয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম জন্মই নিয়েছিল বিজ্ঞানের সূতিকা-গৃহে *হেরা থেকে দারুল আরকাম আসহারে সুফফা বাগদাদ আল হামরা আল আজহার আলী গড় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আন্তজার্তিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম। মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া *পাকিস্তান *তুরস্ক *সৌদী আরব *কাতার *শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় *বুয়েট *চুয়েট (স্টার মার্ক হাতের লেখা)
হযরত আলী (রাঃ) মদীনাতে অবস্থান করিয়া সাহাবাদিগকে সুশিক্ষিত করিবার উদ্দেশ্যে প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছিলেন। তিনি ও তাঁহার পিতৃব্য আব্বাসের পুত্র আবদুল্লাহ্ (ইবনে আব্বাস) মদীনার মসজিদে বিজ্ঞান, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, হাদীস, অলংকারশাস্ত্র ও মুসলমানদিগের সাধারণ বিধি সম্বন্ধে বক্তৃতা প্রদান করিতে এবং অপরাপর বক্তা অন্যান্য বিষয়ে উপদেশ দান করিতেন। যে শিক্ষা ও সভ্যতার জন্যে বাগদাদের খলীফাগণ এককালে জগতে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন, সেই শিক্ষা ও সভ্যতার বীজ এই প্রকারে মদীনার মসজিদে প্রথম রোপিত হইয়া ছিল।“১
“জ্ঞান-গবেষণা আল্লাহ্র প্রশংসাস্বরূপ। জ্ঞানানুসন্ধান আল্লাহ্রই ইবাদত। জ্ঞানদানের শিক্ষক দানের সওয়াব অর্জনের অধিকারী এবং যিনি ইহা উপযুক্ত পাত্রে অর্পণ করেন, এটাও তার মূল বন্দেগী। জ্ঞানী ব্যক্তিই পাপ-পূণ্য নির্ণয়ের প্রকৃত বিচারক।
১. আরব জাতির ইতিহাস ঃ সৈয়দ আমীর আলী।
(১৮) ১. স্পিরিট অব ইসলামঃ সৈয়দ আমীর আলী ২. বিজ্ঞানে মুসলমানের দানঃ এম. আকবর আলী।
খালিদ
৬৮৩ খৃস্টাব্দে উমাইয়া খলীফা ২য় মাবিআর মৃত্যুর পর তদীয় ভ্রাতা এবং প্রথম ইয়াযিদের শিশুপুত্র খালিদ সিংহাসনারোহণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর অভিভাবকরূপে প্রধান অমাত্য বৃদ্ধ মারওয়ান ইবনে হাকাম খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই মারওয়ান খালিদের পরিবর্তে তাঁর পুত্র আবদুল মালিককে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। ইয়াযিদ-পুত্র খালিদ সম্পর্কে জানা যায়-তিনি জ্যোতিষবিদ্যা, চিকিৎসা ও রসায়নশাস্ত্রে পা-িত্য অর্জন করেছিলেন। তাঁকে ‘আল-হাকিম’ আখ্যায়িত করা হয়েছিল।
গ্রীক বিজ্ঞানের প্রতি খালিদের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। খালিদ বিন ইয়াজিদ গ্রীকদের বিজ্ঞান গ্রস্থগুলো তিনিই প্রথম অনুবাদ শুরু করেন। এই বিজ্ঞান গ্রন্থগুলোর অনুবাদের মধ্যে তাঁর কর্তব্য সীমাবদ্ধ ছিল না। নিজস্ব গবেষণাতেও তিনি নিমগ্ন ছিলেন। স্বর্ণ প্রস্তুতের ক্ষেত্রে তিনি নাকি স্পর্শমণি পর্যন্ত আবিস্কারে সফল হয়েছিলেন। এই স্পর্শমণির সাহায্যে স্বর্ণ প্রস্তুত করা যেত। এই স্থপতি বৈজ্ঞানিক ৭০৪ খৃস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন
২০) জ্যোতিবিজ্ঞানে মুসলমান
বিভিন্ন বাণীতে সচেতন করে তুলেছিলেন। কারণ বিজ্ঞান ছাড়া মুসলমানরা চলতে পারে না।
ইসলাম ধর্মটি বৈজ্ঞানিক ধর্ম
জ্যোতিবিজ্ঞান “নিশ্চয়ই সময়মত নামায আদায় মুমিনদের উপর ফরয।” শুধু নামায ফরয নয়, নামাযের সময়সীমাটুকুও ফরয। সুতরাং নামায-রোযার সময় নির্ধারণ ও অনুষ্ঠানাদির প্রয়োজনেই জ্যোতিবিজ্ঞানের প্রয়োজন। চন্দ্র-সূর্যের গতিবিধি জানা ইসলামের ধর্মীয় প্রয়োজন।
হযরত আলী (রাঃ) থেকে আরব সভ্যতার বিজ্ঞান গবেষণার সূচনার কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ তাঁর এ জ্ঞান গ্রীকদের বা আর্যদের কাছে থেকে ধার করা ছিল না। আর্কিমিডিস, ইউকিèড, টলেমি প্রমূখ মহাজ্ঞানীর মত তিনি ছিলেন প্রায় সর্বতোমুখী মৌলিক জ্ঞানের অধিকারী।
একদিকে রণ-দুর্মদ মহাবীর, অন্যদিকে উদ্ভাবক বিজ্ঞানী-এই দুটি গুণের সমম্বয় বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। এ গুণ হযরত আলী (রাঃ)-র মধ্যেই সমন্বিত হয়েছিল। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইব্নে আব্বাস (রাঃ), হযরত যায়দ (রাঃ) প্রমূখের দ্বারা ৬৬১ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত সারাসিন সভ্যতার বিভিন্ন বিজ্ঞান গবেষণার সূত্রপাতের স্বর্ণযুগও বলা যায়।
দেশের অস্বাভাবিক সময়েও বিজ্ঞান চর্চা অব্যাহত ছিল ৬৬১ খৃস্টাব্দে হযরত আলী (রাঃ) শহীদ হওয়ার পরও উমাইয়া শাসনের প্রায় সূচনা থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনা প্রায় অব্যাহত ভাবেই চলছিল। ৬৮৩ খৃস্টাব্দে যদিও খলীফা আবদুল মালিক রাজ্য শাসন ও যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু সিংহাসন বঞ্চিত খলীফা খালেদ পূর্ণোদ্যমেই গ্রীকদের বিভিন্ন গ্রন্থ সর্বপ্রথম সংগ্রহ ও অনুবাদ শুরু করে আরব সভ্যতাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করার সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। নিজেও বিশেষ করে রসায়ন বিজ্ঞানে গভীরভাবে গবেষণা শুরু করেন। সুতরাং উমাইয়া শাসনেরও শত প্রকার রাজনৈতিক বিপর্যয় ও যুদ্ধের ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও বিজ্ঞান সাধনা অব্যাহতভাবেই চলছিল।
খলীফা আবদুল মালিক আরবী ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় মর্যাদা দিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আরবীকে বৈজ্ঞানিক ভাষার যোগ্যতা অর্জনের শুভ সূচনা করেন।
(২১) মুসলিম অবদান
আব্বাসীয় শাসনামলে খৃস্টীয় সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত আরবী ভাষা বিশ্ব সভ্যতায় জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশের একমাত্র অবিসম্বাদিত আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ভাষার
মর্যাদা লাভ করে, সেই আরবী ভাষা উমাইয়া যুগেই বিজ্ঞান ও অন্যান্য উন্নতমানের শাস্ত্র পরিবহন উপযোগী ভাষায় গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বসরার বিখ্যাত প-িত আসওয়াদ সর্বপ্রথম আরবী ব্যাকরণ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর সুযোগ্য ছাত্র খলিল ইবনে আহমদ প্রথম আরবী ব্যাকরণ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। উমাইয়া যুগে যদি বিজ্ঞান পরির্চ্চার উপযোগী পরিভাষা ও উন্নতমানের ব্যাকরণ কাঠামো গড়ে না উঠত, তাহলে বিজ্ঞানের পরবর্তী অবয়ব গঠনে স্বাধীন পটভূমিকার অভাব দেখা দিত।
খুলাফায়ে রাশিদীন এবং উমাইয়া শাসনের সুদীর্ঘ ১২০ বছর একদম বিজ্ঞান বর্জিত ছিল, একথা সত্য নয়। ইসলামের সর্র্বাঙ্গই বৈজ্ঞানিক আদর্শ দ্বারা গঠিত। ইসলাম বিশ্বাসের মৌলিকতা ও মুক্তি প্রমাণ উপাদান দ্বারা গঠিত।
জ্ঞান-বিজ্ঞান রণ-চাঞ্চল্যের রাজ্য জয়-পরাজয়ের মধ্যে অবলুপ্ত ছিল মনে করা অযৌক্তিক। তবে একথা সত্য যে, আব্বাসীয় খিলাফত কালে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে জয়যাত্রা শুরু হয়, এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ কোন সংগৃহীত প্রমাণপঞ্জী এখনও আমাদের হাতে নেই।
প্রকৃতপক্ষে খলীফা মনসুরের শাসনামল থেকেই সারাসিন সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্বব্যাপী জয়যাত্রা নিয়মিত অভিযান শুরু হয়। খলীফা মনসুর (৭৫৪-৭৭৫)-এর রাজদরবার সর্বদা প-িতম-লী দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকত। তিনিই বাগদাদ নগরীর প্রথম প্রতিষ্ঠাতা। টাইগ্রীস নদীর পশ্চিম তীরে বাগদাদ নামক একটি বড় গ্রামে তিনি রাজধানী স্থাপন করে নাম রাখেন ‘মদীনাতুস সালাম’। কিন্তু মানুষ সরকারী নাম গ্রহণ না করে ‘বাগদাদ গ্রামের নামেই নতুন রাজধানীকে অভিহিত করতে থাকে।
(হাতের লেখা) জ্ঞানের প্রসঙ্গ লইয়া হযরতের পয়কাম্বরী জীবন শুরু।
(২২) বিশ্ব সভ্যতায় (হাতের লেখা) গারসিক ও ইয়াহুদী
প্রাচীন ব্যবিলন নগরী যেখানে অবস্থিত ছিল, বাগদাদ নগরী সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
নও-বখত নামক একজন পারসী ইঞ্জিনিয়ার রাজধানীর নক্শা তৈরী করেন এবং মাশাল্লাহ্ নামক একজন য়াহূদী বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতিবিদের পরামর্শ অনুসারে ৭৬২ খৃস্টাব্দে খলীফা আল-মনসুর বিশ্ববিখ্যাত বাগদাদ নগরী প্রথম প্রতিষ্ঠা শুরু করেন এবং ৭৬৬ খৃস্টাব্দে নির্মাণ কার্য সমাপ্ত করেণ। ইরাক, সিরিয়া প্রভৃতি স্থান হতে সংগৃহীত প্রায় এক লক্ষ শ্রমিক ও শিল্পী কারিগর ৪ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে তৎকালীন সারাসিন সভ্যতার এবং বিশ্বের বিস্ময়কর শীর্ষ নগরীর নির্মাণ কার্য সমাপ্ত করেন। প্রাথমিক নির্মাণ কার্য ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৫০ লক্ষ দিরহাম। ইঞ্জিনিয়ার নও-বখত ও মাশাল্লাহ্ সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারায় বাগদাদ দুই প্রাচীর বেষ্টিত গোলাকারে নির্মিত হয়। মতান্তরে বাগদাদ ৭৬৪Ñ৭৬৮ খৃস্টাব্দে নির্মিত হয়েছে বলে উল্লেখ আছে।
উমাইয়া শাসনের শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তির দিকেই অত্যধিক জোর দেওয়া হয়। আব্বাসীয় যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিকে জোর দেওয়া হয় বেশী। এ দুটোর সমন্বয় না থাকার জন্যেই সারাসিন সভ্যতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি।
আব্বাসীয় বংশের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাসের উপাধি হলো ‘আসৃসাফফা’Ñঅর্থ হলো ‘রক্ত-পিপাসু’। ‘যেখানেই পাও, উমাইয়াদের পাইকারীভারে হত্যা কর’Ñএই ছিল তার নীতি।
(২৩) মুসলিম অবদান ১. ইসলামের ইতিহাসঃ টি আলী, পৃষ্ঠা ৩১৮। ২. ইসলামের ইতিহাসঃ টি আলী, পৃষ্ঠা ৩২৯।
যদিও খলীফা আব্বাস আব্বাসীয় বংশ প্রতিষ্ঠা করেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিচক্ষণ খলীফা আল-মানসুরকেই এই বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন।
বরং তিনি (মনসুর) নতুন বংশকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁহার পরে যে পঁয়ত্রিশজন আব্বাসীয় খলীফা শাসনদ- পরিচালনা করেন, ইসলামী সভ্যতা তথা সারাসিন সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞানের তাঁকেই প্রতিষ্ঠাতা বলা যেতে পারে। তিনি ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও বিদ্যুৎসাহী। তাঁর রাজসভা শুধু যে বিভিন্ন প-িত দ্বারাই পরিপূর্ণ থাকত, তাই নয়, তিনি নিজেও একজন জ্যোতিবিজ্ঞানী ছিলেন। আব্বাসীয় বংশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্যে শত্রু নির্মূল করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য ও নীতিগতকর্তব্য।
খলীফা মনসুর সম্বন্ধে ঐতিহাসিক মুর বলেন “বিপদজ্জনক ও ঘৃণার্হ ব্যক্তিদের নিমূল করিতে মনসুর যে পন্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন, ক্ষণিকের জন্যে সে দিকটির কথা বিস্মৃত হইতে পারিলে তাঁহার সম্পর্কে আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা হইবে।
“সৈন্য ও প্রজাগণকে সন্তুষ্ট রাখিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করিবে। শাস্তিদানের ব্যাপারে মাত্রা অতিক্রম করিও না এবং যাহাদের নিকট সদুপদেশ পাও, তাহাদের মধ্যে বন্ধুত্ব বজায় রাখিও।
(২৪) বিশ্ব সভ্যতায়
চীন
ইতিহাসে দেখা যায়, নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী হিসাবে পরিচিত শাসকদের মধ্যেও বহু সদ-ণ বিদ্যমান ছিল। যেমন, চেঙ্গিস খান (১১৬২-১২২৭) ইয়েলিও কুৎসাই নামে একজন চীনা প-িতকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন এবং এই চীনা প-িত তাঁর উপদেষ্টা ছিলেন। চেঙ্গিস নারী নির্যাতন ঘৃণা করতেন এবং শাসনের ক্ষেত্রে সুবিচারক ছিলেন। ইতিহাসে নৃশংস বলে পরিচিত হালাকু খান ১২৫৮ খৃস্টাব্দে বাগদাদ নগরী রক্তের সাগরে পরিণত করেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থগুলোকে দজলা বা টাইগ্রীস নদীতে ডুবিয়ে দেন। সেই হালাকু খানও ছিলেন মহাপ-িত নাসিরউদ্দীন তুসীর অন্ধ সমর্থক। জনাব তুসী যা-ই বলতেন, তিনি তাই করতেন।
১২৫৯ খৃস্টাব্দে জ্যোতিষ ও জ্যোতিবিজ্ঞানী নাসিরউদ্দীন তুসীকে দিয়ে হালাকু খান সারাখার বিশ্ববিখ্যাত মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। আজীবন সুধীম-লী ও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। আর এক অত্যাচারী বিজয়ী তৈমুর লং স্ত্রীর নামে গজনীতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। প-িত এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের জন্যে তিনি অজ¯্র অর্থ ব্যয় করে উৎসাহ দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
রাজনৈতিক প্রয়োজনে নিপীড়ন ও অত্যাচার চিরকাল পৃথিবীতে প্রচলিত ছিল বা আছে। পাইকারী হত্যায় আনন্দ বোধ দূরে থাকুক,
আল মনসুর
রাজকীয় কার্য থেকে একটু অবসর পেলেই তিনি জ্যোতিবিজ্ঞান সাধনায় ডুবে যেতেন। তাঁকে জ্যোতিবিজ্ঞানের জনক বললেও অত্যুক্তি হয় না। কারণ তিনিই আরবের প্রথম জ্যোতিবিজ্ঞানী। একথা আমাদের নয়, সুপ্রসিদ্ধ ইউরোপীয় ঐতিহাসিক মিঃ বোসো বলেন, আরব জ্যোতিবিদদের মধ্যে খলীফা আল-মনসুর সর্বপ্রথম।” তাঁরই প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপের দ্বারা আরব বৈজ্ঞানিক ও খলীফাদের উৎসাহ এবং পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রীক, রোম, আর্য প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকারের দর্শন বিজ্ঞান প্রভৃতির ব্যাপকভাবে অনুবাদ শুরু হয়। ফলে বিজ্ঞান আজো পৃথিবীতে বেঁচে আছে।
ইসহাক আল-ফাজারী, ইয়াকুব ইবনে তারিক, আবু ইয়াহিয়া আল বাতরিক, নও-বখত, মাশাল্লাহ প্রমূখ বৈজ্ঞানিক মনসুরের রাজ-দরবারের সভাসদ ছিলেন।
মাশাল্লাহ্ (মৃত্যু ৮১৫ কিংবা ৮২০ খৃস্টাব্দ) জাতিতে মিসরীয় য়াহূদী বৈজ্ঞানিক ছিলেন। জাতিতে যা-ই হউন, প্রতিভার পূর্ণ মর্যাদা দানকারী উদার মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর বিজ্ঞান প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ লাভ সম্ভব হয়। বাগদাদের ভিত্তি স্থাপনের সময় বৈজ্ঞানিক ও ইঞ্জিনিয়ার আল-নও-বখতের সঙ্গে মাশাল্লাহ্ যে কারিগরি প্রকৌশল ও পরিকল্পনায় দক্ষতা প্রকাশ করেন, তাতেই তাঁর প্রতি খলীফার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। জ্যোতিষ ও জ্যোতিবিজ্ঞানেও তিনি সুপন্ডিত ছিলেন। কারিগরির যন্ত্র নির্মাণ বিশেষভাবে জ্যোতিবিজ্ঞান সম্পর্কিত যন্ত্র নির্মাণে তার অদ্ভুত দক্ষতা ছিল। তিনি সূর্য নক্ষত্রের উষ্ণতা নির্ণয়ক আ-ারলব যন্ত্র নির্মাণ করেন। এই যন্ত্রের উপর নির্ভর করেই দ্বাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক রবিব-ইজরা এ সম্বন্ধে গ্রন্থ প্রণয়ন করে বিখ্যাত হন। মাশাল্লাহ্ বায়ু বিজ্ঞান বিষয়ক কতগুলো গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। নবম শতাব্দীর বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আল-ফারগানীও তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হন, তাঁর মূল্য নিরূপক গ্রন্থাবলী আরব বৈজ্ঞানিকদের প্রথম গ্রন্থ। বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক এবং অনুবাদক জোহানেস দ্য-লুনা হিসপালেনসিস তাঁর কতগুলো গ্রন্থ ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। জিরার্ড কর্তৃকও তাঁর গ্রন্থ অনুদিত হয়।
(হাতের লেখা) আরব-ভারতীয় বৈজ্ঞানিক সহযােগতিা
৭৬৭ খৃস্টাব্দে ভারতীয় বৈজ্ঞানিক কঙ্কের সঙ্গে ইয়াকুব ইবনে তারিকের মনসুরের দরবারে সাক্ষাৎ হয়। কঙ্কের অনুপ্রেরণায় ইয়াকুব জ্যোতিবিজ্ঞানে অনুপ্রাণিত হন এবং গোলক ও কারদাজার প্রভৃতি বিজ্ঞান সম্পর্কে কয়েকটি পুস্তক প্রণয়ন করেন। ৭৭৭ খৃস্টাব্দে গ্রন্থগুলো রচিত হয়। ভারতীয় বিজ্ঞান গ্রন্থ ‘সিন্দহিন্দ’ আরবীতে অনুবাদ করনে দ্বিতীয় ফাজারী।
উল্লখ্যে,খলীফা আল-মনসুর ভারতের সঙ্গে এমন সভ্যতা স্থ্পানের প্রয়াসী হন যে, ভারতীয় বৈজ্ঞানিক কঙ্ক তাঁর নিজস্ব রাজকীয় বৈজ্ঞানিকদের সংযোগ স্থাপনপূর্বক মত ও ভাব বিনিময় করতেন। তাঁর কেন্দ্রীয় হাসপাতালে চিকিৎসক হিসাবে একজন ভারতীয়কে প্রধান চিকিৎসক (কবিরাজ) নিযুক্ত করেন। তাঁর নাম কি ছিল জানা যায় না। তবে আরবরা তাঁর প্রতি এত সশ্রদ্ধ ছিলেন যে, তাঁদের মাতৃভাষায় তাঁকে ইবনে দহন বলে ডাকতেন।
আযুর্বেদ চিকিৎসা বজ্ঞিান
ইবনে দহনকে খলীফা মনসুরের প্রধান চিকিৎসক নিযুক্ত করার এমনও উদ্দেশ্য হতে পারে, আযুর্বেদ শাস্ত্রের উপর আরবদের অনুবাদের দ্বারা ঔপপত্তিক জ্ঞান লাভের পরও প্রত্যক্ষ ব্যবহারিক জ্ঞান এই চিকিৎসকের মারফত আরব চিকিৎসকগণ জ্ঞাত হয়ে আরব চিকিৎসা বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করা। খলীফা মনসুর ভারতে নৃপতি ও বৈজ্ঞানিকদেরকে উৎসাহিত ও প্ররোচিত করতেন, যাতে বিভিন্ন গ্রন্থসহ বৈজ্ঞানিকগণ বাগদাদে আগমন করেন। বিজ্ঞান গ্রন্থগুলো এইভাবে করায়ত্ত করে আরব বৈজ্ঞানিকদের দিয়ে অনুবাদের ব্যবস্থা করতেন। এই মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে প্রধানত আল-ফাজারীই অতি উৎসাহী ছিলেন। আল-ফাজারীর উদ্যমের ফলেই তখনকার ভারতের বিখ্যাত জ্যোতিবিজ্ঞানী কঙ্ক বা বাঙ্কায়ণ ৭৭১ খৃস্টাব্দে ভারতের বিখ্যাত বিজ্ঞান গ্রন্থ ‘সিন্দহিন্দ’ সঙ্গে নিয়ে বাগদাদে খলীফা মনসুরের রাজসভায়
(২৮)
উপস্থিত হয়ে খলীফার রাজ-আতিথেয়তার মর্যাদা রক্ষা করেন। ‘সিন্দহিন্দ’ কঙ্ক অথবা ব্রহ্ম গুপ্তের সূর্য সিদ্ধান্ত নামক জ্যোতিবিজ্ঞান গ্রন্থের খ- সংস্করণ বিশেষ।
৭৬৭ খৃস্টাব্দেও বৈজ্ঞানিক কঙ্ক খলীফার বিজ্ঞান সভায় আমন্ত্রিত হয়ে যোগদান করেছিলেন। তখন বৈজ্ঞানিক ইয়াকুব ইবনে তারিকের সঙ্গে বহু উৎসাজনক আলোচনা হয়। শ্রীযুক্ত কঙ্ক তাঁর জ্যোতিবিজ্ঞানে বহুভাবে উৎসাহিত করেন। এ সম্বন্ধে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সিন্দহিন্দ ছাড়াও খলীফার আগ্রহে ‘আরক-’ বা ‘মন্দখাদ্যক’ এবং ‘আর্য্য ভট্টীয়’ প্রভৃতি বিজ্ঞানগ্রন্থও বাগদাদে আনয়ন এবং এ সবের আরবী অনুবাদ করা হয়। আর্য্য ভট্টীয় গ্রন্থের লেখক আর্য্যভট্ট ভারতের অনন্য বৈজ্ঞানিক। তিনি পাটনার নালন্দা বিশ্বদ্যিালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। আর্য্যভট্ট পাটনার কসুমপুরে ৪৭৬ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। আল-বেরুনী তাঁকে কুসুমপুরের আর্য্যভট্ট বলতেন।
আবু ইয়াহিয়া আল-বাতরিক
আবু ইয়াহিয়া আল-বাতরিক গ্রীক বৈজ্ঞানিক টলেমির ‘টেট্রাবিবলস’ গ্রন্থ অনুবাদ করেন। তিনি তৎকালীন প-িত সমাজে অঙ্কশাস্ত্রবিদ হিসাবে প্রশংসা অর্জন করেন। শুধু অঙ্কশাস্ত্রবিদ নয়, জ্যোতিবিজ্ঞানী হিসাবে তিনি পূর্বেই বিখ্যাত ছিলেন। তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপরও অনেকগুলো বই লিখেন। কারণ তিনি নিজেও বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ‘টেট্রাবিবলস’ অনুবাদ করেন ।
আল নও-বখত
আল নও-বখত (মৃত্যু ৭৭৫ খৃস্টাব্দে) জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশেষ পারদশী ছিলেন। তিনি জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এর নাম হলো ‘কিতাবুল আহ্কাম’। ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় যে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল, বাগদাদের ভিত্তি স্থাপনই এর প্রমাণ।
খলীফা আল-মনসুরকে বর্তমান সভ্যতার জ্ঞানবিজ্ঞানের জনক বলা যেতে পারে। কারণ সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এবং আন্তঃ সাম্প্রদায়েক বৈজ্ঞানিক সম্প্রীতির স্থাপতি)
উল্লখ্যে, তৎকালীন ভয়াবহ ধর্মীয় গোড়ামীর বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ধার্মিক মুসলমান হয়েও মুসলমান, য়াহূদী, হিন্দু, খৃস্টান প্রভৃতি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে অতিশয় মুক্ত উদার ও ন্যায় নিরপেক্ষ মন নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতা থেকে, বিজ্ঞানের গ্রন্থানুবাদ, গ্রন্থ সংগ্রহ, জ্ঞান আহরণ এবং বৈজ্ঞানিকদেরকে নিশ্চিন্ত-নিবিষ্ট মনে যদি জ্ঞান বিকাশের জন্যে উৎসাহিত না করতেন, তাহলে আরব শাসক ও বৈজ্ঞানিকদের এই আদর্শের জ্বলন্ত প্রেরণা আসত না এবং মনসুরের আদর্শের প্রেরণা প্লাবনে আরব বিজ্ঞান জগতে এ ধরনের নবজাগরণও আসত না। এই মহাপ্রেরণাই নতুন পথ প্রদর্শন করে, নবজাগরণের জোয়ার-তরঙ্গ সৃষ্টি করে, আরবদেরকে ক্রমশ বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারায় এমন কি পরিশেষে গ্রীক বিজ্ঞানকেও ডিঙ্গিয়ে গিয়ে, বিজ্ঞান জগতের শীর্ষস্তরে উত্তোলন করতে সক্ষম হয়েছে।
আবু ইসহাক আল-ফাজারীর প্রচেষ্টায় ভারতীয় বৈজ্ঞানিকের বার বার বাগদাদ শুভাগমন সম্ভব হয়। ভারতীয় বৈজ্ঞানিকের প্রতি মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের দৃষ্টি আর্কষণ ও উদ্বুদ্ধ করা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রত। অবশ্য এর পেছনে ছিল খলীফা মনসুরের সদিচ্ছা।
আল-ফাজারীর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র দ্বিতীয় আল-ফাজারী খলীফা মনসুরের আদেশে সর্বপ্রথম ৭৭২-৭৭৩ খৃস্টাব্দে ‘সিন্দহিন্দের’ আরবী অনুবাদ করেন। আল-ে
উপস্থিত হয়ে খলীফার রাজ-আতিথেয়তার মর্যাদা রক্ষা করেন। ‘সিন্দহিন্দ’ কঙ্ক অথবা ব্রহ্ম গুপ্তের সূর্য সিদ্ধান্ত নামক জ্যোতিবিজ্ঞান গ্রন্থের খ- সংস্করণ বিশেষ।
৭৬৭ খৃস্টাব্দেও বৈজ্ঞানিক কঙ্ক খলীফার বিজ্ঞান সভায় আমন্ত্রিত হয়ে যোগদান করেছিলেন। তখন বৈজ্ঞানিক ইয়াকুব ইবনে তারিকের সঙ্গে বহু উৎসাজনক আলোচনা হয়। শ্রীযুক্ত কঙ্ক তাঁর জ্যোতিবিজ্ঞানে বহুভাবে উৎসাহিত করেন। এ সম্বন্ধে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সিন্দহিন্দ ছাড়াও খলীফার আগ্রহে ‘আরক-’ বা ‘মন্দখাদ্যক’ এবং ‘আর্য্য ভট্টীয়’ প্রভৃতি বিজ্ঞানগ্রন্থও বাগদাদে আনয়ন এবং এ সবের আরবী অনুবাদ করা হয়। আর্য্য ভট্টীয় গ্রন্থের লেখক আর্য্যভট্ট ভারতের অনন্য বৈজ্ঞানিক। তিনি পাটনার নালন্দা বিশ্বদ্যিালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। আর্য্যভট্ট পাটনার কসুমপুরে ৪৭৬ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। আল-বেরুনী তাঁকে কুসুমপুরের আর্য্যভট্ট বলতেন।
আবু ইয়াহিয়া আল-বাতরিক
আবু ইয়াহিয়া আল-বাতরিক গ্রীক বৈজ্ঞানিক টলেমির ‘টেট্রাবিবলস’ গ্রন্থ অনুবাদ করেন। তিনি তৎকালীন প-িত সমাজে অঙ্কশাস্ত্রবিদ হিসাবে প্রশংসা অর্জন করেন। শুধু অঙ্কশাস্ত্রবিদ নয়, জ্যোতিবিজ্ঞানী হিসাবে তিনি পূর্বেই বিখ্যাত ছিলেন। তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপরও অনেকগুলো বই লিখেন। কারণ তিনি নিজেও বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ‘টেট্রাবিবলস’ অনুবাদ করেন ।
আল নও-বখত
আল নও-বখত (মৃত্যু ৭৭৫ খৃস্টাব্দে) জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশেষ পারদশী ছিলেন। তিনি জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এর নাম হলো ‘কিতাবুল আহ্কাম’। ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় যে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল, বাগদাদের ভিত্তি স্থাপনই এর প্রমাণ।
খলীফা আল-মনসুরকে বর্তমান সভ্যতার জ্ঞানবিজ্ঞানের জনক বলা যেতে পারে। কারণ সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এবং আন্তঃ সাম্প্রদায়েক বৈজ্ঞানিক সম্প্রীতির স্থাপতি)
উল্লখ্যে, তৎকালীন ভয়াবহ ধর্মীয় গোড়ামীর বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ধার্মিক মুসলমান হয়েও মুসলমান, য়াহূদী, হিন্দু, খৃস্টান প্রভৃতি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে অতিশয় মুক্ত উদার ও ন্যায় নিরপেক্ষ মন নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতা থেকে, বিজ্ঞানের গ্রন্থানুবাদ, গ্রন্থ সংগ্রহ, জ্ঞান আহরণ এবং বৈজ্ঞানিকদেরকে নিশ্চিন্ত-নিবিষ্ট মনে যদি জ্ঞান বিকাশের জন্যে উৎসাহিত না করতেন, তাহলে আরব শাসক ও বৈজ্ঞানিকদের এই আদর্শের জ্বলন্ত প্রেরণা আসত না এবং মনসুরের আদর্শের প্রেরণা প্লাবনে আরব বিজ্ঞান জগতে এ ধরনের নবজাগরণও আসত না। এই মহাপ্রেরণাই নতুন পথ প্রদর্শন করে, নবজাগরণের জোয়ার-তরঙ্গ সৃষ্টি করে, আরবদেরকে ক্রমশ বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারায় এমন কি পরিশেষে গ্রীক বিজ্ঞানকেও ডিঙ্গিয়ে গিয়ে, বিজ্ঞান জগতের শীর্ষস্তরে উত্তোলন করতে সক্ষম হয়েছে।
আবু ইসহাক আল-ফাজারীর প্রচেষ্টায় ভারতীয় বৈজ্ঞানিকের বার বার বাগদাদ শুভাগমন সম্ভব হয়। ভারতীয় বৈজ্ঞানিকের প্রতি মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের দৃষ্টি আর্কষণ ও উদ্বুদ্ধ করা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রত। অবশ্য এর পেছনে ছিল খলীফা মনসুরের সদিচ্ছা।
আল-ফাজারীর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র দ্বিতীয় আল-ফাজারী খলীফা মনসুরের আদেশে সর্বপ্রথম ৭৭২-৭৭৩ খৃস্টাব্দে ‘সিন্দহিন্দের’ আরবী অনুবাদ করেন। আল-ে
-বেরুনীর মতে এর পূর্বেই ৭৭০-৭৭১ খৃস্টাব্দে ‘সিন্দেিন্দর’ আরবী অনুবাদ হয়ে গিয়েছিল। কোন্ বৈজ্ঞানিক এ পুস্তক অনুবাদ করেছিলেন, তা অবশ্য তিনি উল্লেখ করেন নি।
(২৯) ইয়াহুদী
জ্যোতিবিজ্ঞানের মূল যন্ত্র আ-ারলব সহ অন্যান্য জ্যোতিবিজ্ঞান সম্পর্কিত উন্নতমানের যন্ত্র খলীফা মনসুরের সময় নির্মাণ করা হয়। প্রথম আ-ারলব প্রস্তত করেন একজন মুসলমান বৈজ্ঞানিক। নাম আল-ফাজারী। দ্বিতীয় আ-ারলব যন্ত্রটি প্রস্তুত করেন একজন আরব জাতীয় য়াহূদী বৈজ্ঞানিক। নামÑমাশাল্লাহ্। (হাতের লেখা) অর্থ সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভাবে যতটা না সহাবস্থান সহজ তার চেয়ে ঢের সহজ বৈজ্ঞানিক ভাবে তার প্রমাণ মাশাল্লাহ্ তারিক আজিজ ইরাকের উপ প্রধান মন্ত্রী)
“গ্রীক বিজ্ঞানের নাম-গন্ধও যখন বিলুপ্ত প্রায়, তখনই মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের আবির্ভাব ও পূর্বেকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুসন্ধান বিজ্ঞান জগতে বিধাতার এক আশীর্বাদই বলতে হবে। মুসলমানদের পূর্বে বিজ্ঞান ছিল অজ্ঞান অন্ধকারে নিমজ্জমান প্রায়। গ্রীকদের বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের অনেকগুলিই অধুনা লুপ্ত। আরবী অনুবাদই শুধু পূর্বেকার বৈজ্ঞানিকদের গবেষণার ফল জগতকে শিক্ষা দিচ্ছে।
(আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিকথা)
গ্রীক বিজ্ঞানের মানােন্নয়নে মুসলমি বজ্ঞিানী
গ্রীক বিজ্ঞানের এত উন্নতির সাক্ষ্য হিসাবে রয়েছে মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের অনুবাদ কার্য এবং তারই উপর নির্ভর করে ইউরোপের বর্তমান বৈজ্ঞানিক অভিযান।
মুসলমানগণ যখন পুরাতন বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ অনুবাদ এবং নব নব জ্ঞান আহরণে নিযুক্ত, খৃস্টীয় ইউরোপ তখন অজ্ঞান অন্ধকার সমাচ্ছন্ন। ইউরোপে চলছিল তখন অসভ্যতার অভিযান, বর্বরতার চরম নির্দশন, ধর্মের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ।“১
(৩০)
সুতরাং প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থগুলো আরবরা যে আরবী ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন, আরবদের সেই জরাজীর্ণ পা-ুলিপিগুলো থেকেই আধুনিক বিজ্ঞানের সূত্রপাত হয়। একথা অকাট্য সত্য।
এ প্রসঙ্গে ইউরোপীয় ঐতিহাসিক ড্রাপার বলেন, “আরবগণ নভোম-লে যে অম্লান হস্তছাপ রাখিয়াছেন, তাহা যে কোন ব্যক্তি ভূ-ম-লের নক্ষত্র সম্বন্ধীয় জ্ঞান আহরণ কালে উপলব্ধি করিতে পারিবেন।“১
(হাতের লেখা) মানুষের ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ পরিসরের সুযোগ-সুবিধা কল্যাণ উপকারের জন্য যত সব আবিস্কার উদ্ভাবন। বলা যায় “বিজ্ঞান মানুষের জন্য” ঝপরবহপব ভড়ৎ যঁসধহ”
যে কোন বিষয়ের উপর বিশেষ জ্ঞানকেই ‘বিজ্ঞান’ নামে অভিহিত করা হয়। সুই, কোদাল, কুড়োল থেকে আরম্ভ করে মোটর, রেলগাড়ী, জল জাহাজ, উড়োজাহাজ, বিদ্যুৎ, তৈলের কাজ চলে বিদ্যুৎ দিয়ে, বিদ্যুতের কাজ চলবে আণবিক শক্তি দিয়ে, এসবই মানুষের সুখ সুবিধার জন্যে অসংখ্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা।
বিজ্ঞানকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে চাই। কাগজ, পেন্সিল থেকে আরম্ভ করে নাম জানি না এমন উচ্চস্তরের ক্ষুদ্র-বৃহৎ বস্তু দ্বারা গঠিত যত যন্ত্র জগতে বিদ্যমান আছে, তাকে বলা হয় বস্তু বিজ্ঞান। বস্তু বিজ্ঞান হলো সাধারণ বিজ্ঞান। বস্তু জগত অতিশয় অসহায়। যন্ত্র যত বৃহৎ ও যত শক্তিশালী বা যত উন্নত ও স্বয়ংক্রিয়ই হউক, তার কোন নিজস্ব বিবেক-বুদ্ধি থাকতে পারে না। যত বড় যন্ত্রদানবই হউক, তার শক্তির তুলনায় একটি অতি ক্ষুদ্র মানুষের মানস শক্ষি থেকে সে বেরিয়ে এসেছে। সেই মানুষটি তার গায়ে হাত দিয়ে বোতাম না টিপলে, তার কোন কিছুই করার থাকে না। স্বীকার করে নিলাম, যেমন মানসিক শক্তিই মূল শক্তি, তেমনি মানসিক বিজ্ঞানই মূল বিজ্ঞান।
উল্লেখ্য যে, শত সহ¯্র বছর পূর্ব থেকেই জ্যোতিবিজ্ঞানীরা চন্দ্র সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রের দূরত্ব, আকার, গতিবিধি লক্ষ্য করে আসছেন এবং বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা মানচিত্রও শত সহ¯্র বছর আগে থেকেই অঙ্কন করা হয়ে আছে। এ-তে প্রকৃতই মানসিক বিজ্ঞানের শক্তি-প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন। আসলে জড় বিজ্ঞানও বিজ্ঞান নয়, বিজ্ঞান-ই প্রকৃত বিজ্ঞান।
(হাতের লেখা) খলিফা আল মনসুর মুসলিম রাষ্ট্রনায়কদের বিজ্ঞান র্চ্চা
রাজকার্যে ব্যাপৃত থেকেও বিজ্ঞান র্চ্চার ঘটনা ইসলামী সভ্যতা ছাড়া জগতের ইতিহাসে বিস্ময় কর ও বিরল। এর প্রধান কারণ রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে রাজকার্য ছাড়াও আত্মমর্যাদার জন্যে সকল সময় বৈজ্ঞানিকদের সাথে উঠাবসা করা সম্ভব ছিল না।
পূর্বেকার রাজ আভিজাত্যবোধ ছিল এখনকার তুলনায় আরো বহু গুণে বেশী। বৈজ্ঞানিকদের সাথে সাধারণ কাতারে এসে জ্ঞান সাধনা করা তাদের পক্ষে তাই সহজে সম্ভব ছিল না। কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলেন মুসলিম সুলতান ও খলীফাগণ। তাঁরা বিজ্ঞানীদের সাথে মেলামেশা করতেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে তাঁরা নিজেরাও বিজ্ঞান র্চ্চা করতেন।
ইসলামের সামাজিক সাম্যবাদই এর মৌলিক কারণ, জামা’আতের নামাযে আসতে একটু দেরী হলে সুলতানকে একটু আগে আসা গোলমের পিছনে কাতারে দাঁড়াতে হতো।
নিজেরা বিজ্ঞান র্চ্চা করা ছাড়াও মুসলিম নৃপতিবৃন্দ অজ¯্র অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞান বিকাশের জন্যে বিজ্ঞানীদের উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
(৪৪)
নাস্তিকতাবাদী দার্শনিকের আবির্ভাব
হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর জন্মের দুইশত বছর পূর্বে খৃস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে পারস্যে মাজদাক নামে একজন নাস্তিকতাবাদী দার্শনিকের আবির্ভাব ঘটে। তিনি নারী-পুরুষের অবাধ যৌন মিলনের সাম্যবাদ প্রচার করেন। স¤্রাট নওশেরওয়াঁর সময়োচিত হস্তক্ষেপের ফলে এই মতবাদ দমন লাভ করে। নাস্তিক্যবাদের ভয়াবহ পরিণতি কিন্তু পরবর্তীকালে এই মাজদাক মতবাদই ইরান, খুরাসান প্রভৃতি স্থানে জিন্দিকবাদ নামে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে এবং মানিকিয়ান ধর্মমতের সঙ্গে সংমিশ্রিত হয়ে পাইকারী ব্যভিচারের কদর্য রূপ ধারণ করে, পশুর অনুরূপ নারী-পুরুষের অবাধ যৌন মিলনই এই মতবাদের মূল প্রতিপাদ্য।
জিন্দিকরা সবাই লাল কাপড় পরিধান করত। মাজদাকের ৪ শত বছর পর সেই এলাকাতেই অনুরূপ মতেরই পূর্ণ অভ্যুত্থানে খুরাসান, ইরাক এবং পারস্যে এই মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে। জিন্দিকরা যৌন উচ্ছৃঙ্খলা দ্বরা পারিবারিক ও সমাজ বন্ধনকে ধ্বংস করে, অসহায় শাসন কর্তৃত্ব উৎখাত করে, নারী-পুরুষের অবাধ যৌন মিলনের নারকীয় রাজ্য স্থাপনের প্রয়াসী ছিল। জিন্দিকরা প্রয়োজনানুযায়ী উদ্দেশ্য গোপন করে বাকচাতুর্যের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করত এবং সামাজিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের মূলোৎপাটনই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। বস্তুত শুধু যৌন নৈরাজ্যই নয়। এই জিন্দিকরা রাজনৈতিক নৈরাজ্যসহ সমাজ-সভ্যতার বিরুদ্ধে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
খলীফা মেহেদী কঠোর হস্তে এই আন্দোলন দমন করেন। জিন্দিক মতবাদ বেআইনী ঘোষনা করা হয় এবং জিন্দিকদের যাবতীয় বিষয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
(৪৫) হারুন-উর রশিদঃ বায়তুল হিকমাহর প্রতিষ্ঠাতা
প্রথম রাজনীতি প্রজ্ঞার সঙ্গে অসম সাহসী ক্ষিপ্ত রণকুশলতার সমন্বয় গুণে খলীফা হারুনুর-রশিদের হাতে পশ্চিমে ইউরোপের বাইজানটাইন বা গ্রীক রাজ্য থেকে আরম্ভ করে প্রাচ্যের আফগানিস্তান ও হিন্দুকুশ পর্বতের পাদদেশ পর্যন্ত তাঁর সা¤্রাজ্য বিস্তার লাভ করে। এর ফলে একদিকে গ্রীক সভ্যতা থেকে এবং অন্যদিকে আর্য সভ্যতা থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থসমূহ সংগ্রহ ও জ্ঞান আহরণের পথ সুগম হয়।
(৪৬)
আরব শাসকদের মধ্যে খলীফা হারুনুর-রশিদই সর্বপ্রথম বহিবিশ্বের সঙ্গে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এজন্যে উভয় পক্ষের মধ্যে বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ বহু মূল্যবান ইপঢৌকন বিনিময় হয়। তিনি ফ্রান্স, চীন প্রভৃতি দেশে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।
তখনকার আরব সভ্যতা যে যন্ত্রবিজ্ঞানে কত উন্নত ছিল, একটি নযীর থেকেই তা অনুধাবন করা যাবে।
খলীফা হারুনুর-রশিদ তাঁর বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ ফরাসী স¤্রাট শালিমেনের নিকট একটি অদ্ভুত ঘড়ি উপঢৌকন দেন।
৭৯৯ খৃস্টাব্দে খলীফা হারুনুর-রশিদ ফরাসী স¤্রাট শালিমেনকে যে ঘড়িটি ইপহার দেন, ঘড়িটির ডায়ালে ১২ ঘন্টার প্রতীক হিসাবে ১২টি ছোট দরজা ছিল। প্রত্যেক ঘন্টায় সেই ঘন্টার প্রতীক দরজাটি খুলে যেত। ঘন্টার পরিমাণ অনুযায়ী কয়েকটি ছোট গুলী একটি কাঁসার পাত্রের উপর পড়ে ঘন্টার পরিমাণ অনুযায়ী এক থেকে কয়েকটি শব্দ করত। বেলা বারটার সময় ১২টি ঘন্টা পড়ার পর বারজন ছোট ছোট ঘোড় সওয়ার যোদ্ধা একসঙ্গে
বেরিয়ে এসে ডায়ালের চারদিকে প্যারেড শুরু করে দিত এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিত। এই একটি মাত্র ঘড়িই তখন সমগ্র ইউরোপকে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ করে তোলে।
খলীফা হারুনুর-রশিদ সম্বন্ধে অধ্যাপক হিট্টি বলেন, বিশ্বজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন প্রাচ্যের হারুনুর-রশিদ এবং পাশ্চাত্যের শালিমেনকে লইয়া নবম শতাব্দী পরিক্রমা সূচনা করে। এই দুইজনের মধ্যে আবার হারুন নিঃসন্দেহে অধিক শক্তিশালী এবং উন্নত কৃষ্টির অধিকারী ছিলেন।
পিতামহ খলীফা মনসুর বিভিন্ন ভাষায় বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করার জন্যে যে অনুবাদ বিভাগটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন,
(৪৭) বায়তুল হিকমার প্রতিষ্ঠাতা হারুনুর-রশিদ
হারুনুর-রশিদ তা আরো সম্প্রসারণ করেন। তিনি বায়তুল হিকমা বা ‘জ্ঞান-নিবাস’ নাম দিয়ে বাগদাদে একটি গবেষণাগপার স্থাপন করেন। দেশ-বিদেশের বহু কবি, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, জ্যোতিবিদ, জ্যোতিষবিদ, সাহিত্যিক, গায়ক ও চিকিৎসাবিদ তাঁর রাজসভায় স্থান লাভ করতেন। তম্মধ্যে ব্যাকরণবিদ আসমাই ও শফি, সঙ্গীতজ্ঞ ইবরাহীম মাসুনী, চিকিৎসাবিদ জিবরাইল, অনুবাদক হাজ্জাজ এবং কবি আবু নোরায়েমের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
খলীফা হারুনুর-রশিদ গ্রীক ও ভারত থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থ গুলো সংগ্রহ ও অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। খৃস্টাপূর্ব ৩৩০-২৬০ অব্দের ইউক্লিডের নাম যখন পৃথিবী ভুলে গিয়েছিল, কতগুলো গল্পগুজবের মধ্যেই তাঁর অপ্রমাণিত জীবন ঘুমিয়ে ছিল, হারুনুর-রশিদই তাঁর চামড়ার কাগজের পুটলির বাঁধা জরাজীর্ণ বিজ্ঞান গ্রন্থগুলো বিশেষভাবে খুঁজে বের করেন। (টঈখওউ)
তখনকার সময়ের অন্যান্য প্রাচীন জ্ঞান-গ্রন্থগুলোর মত ইউক্লিডের গ্রন্থও চামড়ার কাগজে ছোট ছোট পুস্তকাকারে খ-ে খ-ে লিখিত ছিল। উইক্লিডের মৃত্যুর পর তার পা-ুলিপিগুলো কেউ খুলে দেখেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ যে ইউক্লিডকে ছাড়া আজকের আধুনিক সভ্যজগতের বিজ্ঞান এক পদও অগ্রসর হতে পারে না, ইউরোপ সেই ইউক্লিডের জন্যে সে দিন কোনরূপ মাথা ঘামায়নি। তার পরিচয়ের জন্যে কেউ কোনদিন প্রয়াস চালাবার প্রয়োজন বোধ করেনি। তিনি গ্রীক না মিসরীয় ছিলেন, এ সম্বন্ধে এখনও সঠিকভাবে কিছুই জানা যায় না। অনেকেই বলেন, তিনি জন্মগ্রহণ করেন মিসরে। তাঁর কর্মজীবন চলে আলেকজান্দ্রিয়ায় এবং তিনি জ্ঞান লাভ করেন এথেন্সে।
খলীফা হারুনুর-রশীদই বিশেষ ব্যবস্থাধীনে ইউক্লিডের বিজ্ঞান গ্রন্থগুলো পূনরুদ্ধার করে আরবী ভাষায় অনুবাদ করে তাঁকে পূনরুজ্জীবিত করেন। তিনি যদি পৃথিবীর সামনে ইউক্লিডকে তুলে না ধরতেন আর আধুনিক বিজ্ঞান জগতে তাঁর বিজ্ঞান গ্রন্থগুলো যদি অজ্ঞাতই থেকে ঐেু, তাহলে আধুনিক বিজ্ঞানের গতি স্তিমিত হয়ে পড়।
(টঈখওউ: আধুনিক বিজ্ঞানের স্থপতি)
(৪৮) জাবির ইবন হাইয়ানে আবির্ভাব
যা হোক, খলীফা হারুনুর-রশিদের রাজত্বকালে ইউক্লিডের জ্যামিতির কতকাংশ আরবীতে অনুদিত হয়। আল-হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ সর্বপ্রথম অনুবাদ শুরু করেন এবং
ষষ্ঠ খ- পর্যন্ত অনুবাদ সমাপ্ত করেন। এ ছাড়াও একজন বিশ্ববিখ্যাত আরব বৈজ্ঞানিকের আবির্ভবও
জাবির ইবনে হাইয়ান (৭২২Ñ৮১৩) ছিলেন বিশেষভাবে রসায়ন শাস্ত্রবিদ। তিনি আরব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ রাসায়নিক এবং বর্তমান রসায়ন বিজ্ঞানের ¯্রষ্টা। শুদ্ধ গণিতশাস্ত্র সম্বন্ধে আলোচনায় তিনি আ-ারলব সম্বন্ধে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। পরে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
(কাগজের মন্ড তৈরি)
১. ভারত বিচিত্র ঃ সমরেশ দেবনাথ, আগস্ট, ১৯৮৩।
২. ইসলামের ইতিহাস ঃ টি. আলী, পৃষ্ঠা ৩৬৬।
তাঁর শাসনে শিল্পী-কারিগর বৈজ্ঞানিকদের সহায়তায় বহু কল-কারখানা গড়ে উঠে। ছেঁড়া নেকড়া দিয়ে মন্ড তৈয়ার করে কাগজ প্রস্তুতের কারখানাও গড়ে উঠে এই সময়ে। বিশেষভাবে ফরাসী স¤্রাটকে তাঁর প্রদত্ত উপঢৌকন-ঘড়িটি দ্বারা বোঝা য়ায় যে, বিজ্ঞানের দিক থেকে তাঁর যুগ কতটা উন্নত ছিল।
(নহরে যুবায়দা)
৮০২ খৃস্টাব্দে হজ্জব্রত পালন উপলক্ষে মক্কা গমন করে হাজীদের পানিকষ্ট নিরসনের জন্যে খলীফা হারুনুর-রশিদের বিদূষী পতœী যুবায়দা নিজ খরচে যে খালটি খনন করে দেন, সেই ‘নহরে যুবায়দা’ নামক খালটির দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্যে যে বৈজ্ঞানিক কারিগরি কলাকৌশল অবলম্বন করা হয়, তা ছিল প্রকৃতই অভূতপূর্ব।
() খলীফা মামুন (বায়তুল হিক্মাহ)
খলীফা হারুনুর-রশিদ বিজ্ঞান গবেষণার জন্য যে জ্ঞান-নিবাস কার্যালয়টি স্থাপন করেছিলেন, খলীফা মামুন তা আরো সম্প্রসারণ করেন। এর নাম ছিল ‘বায়তুল হিকমা’। এতে ছিল বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার ও অনুবাদ কার্যালয়। এখানে পারসিক, হিন্দু, আরবীয়, গ্রীক ও খৃস্টান প-িতগণ শিক্ষা, গবেষণা ও অনুবাদ কার্যে নিয়োজিত থাকতেন। হুনায়ন-ইবনে ইসহাক নামক জনৈক বিখ্যাত শিক্ষাবিদকে খলীফা এর তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করেন। খলীফা বহু দূর-দূরান্তরে প্রতিনিধি প্রেরণ করে। নানা দেশের পুরাতন অমূল্য গ্রন্থাদি উদ্ধার করেন। সংগ্রহকারীদেরকে বিপুলভাবে উৎসাহিত করার জন্যে প্রত্যেক গ্রন্থের সম-ওজনের স্বর্ণমুদ্রা পারিশ্রমিক দিতেন।
আলেকজান্দ্রিয়ার শিক্ষা নিকেতনের অমূল্য লিপিসমূহ, গ্রীসের দর্শন ও বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থাদি এবং পারস্য ও ভারতীয় চমকপ্রদ গল্প গ্রন্থাবলী বাগদাদে আনয়নপূর্বক সুযোগ্য বিশেষজ্ঞ দ্বারা অনুদিত ও সম্পাদিত হতে থাকে। লিউকের পুত্র কোস্টারের তত্ত্বাবধানে হুনায়ন ঈশা, হাজ্জাজ প্রমূখ মনীষী গ্যালেন, প্যাল, ইউক্লিড ও টলেমির চিকিৎসা, জ্যোতিবিদ্যা, অন্যান্য বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থাবলী এবং প্লেটো ও এরিস্টটলের দর্শন গ্রন্থসমূহ আরবী ভাষায় ানুবাদ ও প্রকাশ করা হয়। মানকা ও দুবান নামক দুইজন হিন্দু ও মাহ্য়া নামক জনৈক পারসিক প-িত সংস্কৃত ও পারসী ভাষায় গ্রন্থাবলী আরবীতে অনুবাদ করেন। এই সব অনুবাদ কার্যের ফলে সভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
“এই সকল মনীষীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে মধ্যযুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপের দেশসমূহ তাহাদের নিজস্ব অথচ বিস্মৃত গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের নিদর্শনাবলীর সহিত পূণঃ পরিচিত হয়।”২
(৫০) সৌর বিজ্ঞান মামুন প্রথম মানমন্দির প্রতিষ্টাতা (১. ভারত বিচিত্রঃ সমরেশ দেবনাথ, আগস্ট, ১৯৮৩। ২. ভারত বিচিতঃ সমরেশ দেবনাথ, আগস্ট, ১৯৮৩।
খলীফা মামুন নিজে জ্যোতিবিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি বাগদাদের নিকটবর্তী সামশিরাতে একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।১ জ্যোতিবিজ্ঞান গবেষণার জন্যে ইসলামের ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম মানমন্দির। ইয়াহিয়া ইবনে মনসুর, খালিদ-ইবনে-আবদুল মালিক প্রমূখ জ্যোতিবিদ সৌর জগত সম্বন্ধে বহু নতুন তথ্য আবিষ্কার, করেন এবং ‘প্রামাণিক তালিকাতে’ লিপিবদ্ধ করেন। পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য ও গ্রহাদি সম্বন্ধে ইউরোপের যে ভ্রান্ত ধারণা ছিল, আরব জ্যোতিবিদগণ তা নিরসন করে দেন।
জ্যোতিষশাস্ত্র ছাড়াও গণিত, ভূগোল, চিকিৎসা, রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞানের বহু মৌলিক দিক আবিষ্কার করা হয়। বিশ্ববিখ্যাত, গণিতজ্ঞ, জ্যোতিবিজ্ঞানী ও ভূগোল বিশারদ মুহাম্মদ বিন-মুসা আল খাওয়ারিজমী তাঁর ‘সুরত আল-আরদ’ গ্রন্থে চন্দ্র গ্রহণ, সূর্য গ্রহণ, বিষুব রেখা ও ধুমকেতুর গতিপথ নির্ণয় করেন। আবুল হাসান নামক জনৈক বৈজ্ঞানিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও নৌ-কম্পাস যন্ত্র আবিষ্কার করেন।২
খাওয়ারিজমীর বিশ্ববিখ্যাত বীজগণিত ‘এলমূল আল-জাবর ওয়াল মুকাবিলা’ গ্রন্থ ষোড়শ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে পাঠ্যপুস্তক হিসাবে সমাদৃত ছিল। সেই যুগের বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ উহান্নার ‘দাখাল আল আয়ান’ ছিল চক্ষুরোগ নিবারণের তথ্যপূর্ণ অমূল্য গ্রন্থ।
খলীফা মামুন বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিজক ও দার্শনিকদের নিয়ে প্রতি মঙ্গলবারে আলোচনা সভায় বসতেন। আবু তাম্মাম ও আবু মাতাহিয়া ছিলেন তাঁর সভাকবি।
ঈমাম বাখারীর আবির্ভাব
বিশ্ববিখ্যাত হাদীস সংগ্রাহক হযরত ইমাম বুখারী (রহ.) ঐতিহাসিক ওয়াকিদি, ধর্মীয় আইনবিদ ইমাম শাফি (রহ.) ও আহমদ ইবনে হাম্বল এই যুগেই আত্মপ্রকাশ করে জগদ্বরেণ্য জ্ঞানী হিসাবে ইসলাম জগতে কীতি স্থাপন করেন।
১. ভারত বিচিত্রা ঃ সমরেশ দেবনাথ, আগস্ট, ১৯৮৩।
২. ভারত বিচিত্রা ঃ সমরেশ দেবনাথ, আগস্ট, ১৯৮৩।
(৫১)
খলীফা মামুন বাগদাদের আল-শামসিয়া জুনদি শাহপুর ও দামাসকাসের দুই মাইল উত্তরে কাসিয়াস পর্বতে মানমন্দির তৈয়ার করে শুধু যে জ্যোতিবিজ্ঞানীদের উৎসাহিত ও বিজ্ঞানে নবজীবন দান করেছিলেন তাই নয়, তিনি নিজেও জ্যোতিবিজ্ঞানী ছিলেন এবং অবসর পেলেই নিজেও দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অন্যান্য বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে বসে বসে সাধারণ বৈজ্ঞানিকদের মতই গ্রহ-নক্ষত্রাদির গতিবিধি নিরীক্ষণ করতেন।
গ্রীক বিজ্ঞানের গ্রন্থগুলো সংগ্রহহের জন্যে তিনি যে বিদ্যানুরাগের পরিচয় দেন, তা সত্যি বিস্ময়কর। তিনি স¤্রাট তৃতীয় মাইকেলের নিকট যে সন্দিণর্ত প্রেরণ করেন, তার একটি শর্ত ছিল এই যে, কনস্টান্টিনোপলের রাজকীয় লাইব্রেরীর কতগুলো গ্রীক গ্রন্থ তাঁকে দিতে হবে।
তখনকার পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সামরিক শক্তিশালী ও সর্বাপেক্ষা বৃহৎ সা¤্রাজ্যের অধীশ্বর আব্বাসীয় খলীফাগণ যে ভবে গ্রীক,
(৫২) আল মামুনঃ ঈঊজঘ এর সত্য সত্যতা নির্ধারণ পদ্ধতির উদ্ভাবক
গ্রহ-নক্ষত্রের পর্যবেক্ষণ শুদ্ধ ও সঠিক করার জন্যে বিজ্ঞানী নরপতি আল-মামুন দুই-তিন জায়গায় মানমন্দির প্রস্তুত করেছিলেন। বিভিন্ন স্থানের আহরিত সত্য একত্র ফল ঘোষণা করার ব্যাাপারে তাঁর সেই অনুসৃত নীতি ও পদ্ধতি আধুুিনক জ্ঞিান জগতও অনুকরণ-অনুসরণ করে আসছে।
মূল মধ্যরেখা ও পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করার জন্যে খলীফার আদেশে বৈজ্ঞানিকগণ গবেষণা শুরু করে কৃতকার্য হন।
বিজ্ঞানের যে কোন প্রাথমিক উদ্ভাবন অনুশীলনের দোষ-ত্রুটি ( যে দোষ-ত্রুটি প্রথম থাকবেই) পরবর্তী উৎকর্যের মানদ-ে হেয় প্রতিপন্ন কররে তা অবৈজ্ঞানিক ধারণা বলে ধরে নিতে হবে। কাজেই মূল মধ্যরেখা ও পৃথিবীর পরিধি নির্ণয়ে আরব বৈজ্ঞানিকগণ যে সাফল্য লাভ করেন, তাতে নগণ্য ত্রুটি থাকলেও তাঁরাই সকল উদ্ভাবনের অগ্রপথিক।
আরব বিজ্ঞানি
মামুনের আদেশে আরব বৈজ্ঞানিকগণ ক্রান্তিবৃত্তের তীর্যকতাও নির্ধারণ করেন। এর নির্ধারিত ফল হলো ২৩০ ৩র্৫। পূর্বেকার বৈজ্ঞানিকদের নির্ধারিত মানের চেয়ে এটি আরো সঠিক বর্তমান মানের অতি কাছাকাছি। সিন্দহিন্দ
ভারতীয় বৈজ্ঞানি
৩টি মানমন্দিরের পরীক্ষিত ফলানুসারে মামুনের আদেশে যে তালিকা তৈরী হয়, তার নাম হয় ‘আল জিজ আল-মুসতাহাম’ এ দ্বারা বিখ্যাত জ্যোতিবিজ্ঞান তালিকা প্রস্তুত হয়। এই তালিকা তৈরী করতে ভারতীয় পদ্ধতিতে সিন্দহিন্দের বা সূর্য সিদ্ধান্তের অনুকরণ করা হয়। আল-মামুন অভিজ্ঞ জ্যোতিবিদদের নিয়ে একটি জ্যোতিবিজ্ঞান গ্রন্থও প্রণয়ন করেন।
পদার্থ বিজ্ঞানী আবুল হাসান
পদার্থবিদ আবুল হাসান এখানেই সর্বপ্রথম দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। ৮৩৩ খৃস্টাব্দের পূর্বে আবুল হাসানই দূরবীক্ষণ যন্ত্রের প্রথম ও প্রকৃত আবিষ্কারক। ১৬৪২ খৃস্টাব্দের পূর্বে গ্যালিলিও এর আবিষ্কারক নন, উন্নত সংস্করিক মাত্র। গ্যালিরিওর জন্মের ৭৩১ বছর পূর্বে আবুল হাসান দূরবীক্ষণ যন্ত্রের প্রথম আবিষ্কারক। তাঁরই যন্ত্র
(৫৩) মুসলিম বিজ্ঞানীদের ইতিকথা
কিছুটা উন্নত আকারে পরবর্তীকালে সারাসা ও কায়রোর মানমন্দিরে খগোল বিজ্ঞানের নবযুগ আনয়ন করে খলীফা মামুনের রাজত্বকালেই বিষুব রেখা ও আয়নম-লের সংযোগস্থল, চন্দ্র-সূর্যের গ্রহণ, ধুমকেতুর গতিপথ প্রভৃতি সৌরজগত সংক্রান্ত তথ্য নির্ণয় করা হয়। যাঁদের চেষ্টায় এ সব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্ভব হয়েছিল, তাঁদের সবারই নাম এখনও জানা যায়নি। তবে মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়া রিজমী ও আল-ফ্রাগানাস প্রমূখ ছিলেন অন্যতম নেতৃস্থানীয় বৈজ্ঞানিক।
‘আল-জিজ আল-মুসতাহাম’ তৈরী করতে আবু আলী ইবনে ইয়াহিয়া ইবনে আবি মনসুর ছিলেন অন্যতম। খলীফা তাঁর বিজ্ঞান গবেষণায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে শামসিয়া মানমন্দিরের
মহাপরিচালক নিয়োগ করেন। আল-আব্বাস ইবনে সাঈদ আল জাওহেরী, সাদ ইবনে আলী প্রমুখ বিজ্ঞানীর সহায়তায় ৮২৯-৩০ খৃস্টব্দে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ফল দিয়ে জ্যোতিবিজ্ঞান সম্পর্কে আরবী ভাষায় কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ৮৩১ খৃস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।
টলেমির টেট্রাবিবলসের অনুবাদ করা হয় প্রথম খলীফা মনসুরের সময়। ইয়াহিয়া অনুবাদক ছিলেন কিন্তু তখন এই গ্রন্থের অনুবাদে কোন মন্তব্য ও টীকা লেখা ছিলনা। মামুনের সময় আত তাবারী নামে এক জ্যোতিবিজ্ঞানী সর্বপ্রথম এর ভাষা ও টীকা লেখেন। তিনি মামুনের অভিপ্রায় অনুযায়ী বহু মূল্যবান পারসী গ্রন্থ আরবী ভাষায় অনুবাদ। এ ছাড়া তিনি জ্যোতিবিজ্ঞান সন্বন্ধে আরো বহু গ্রন্ত প্রণয়ন করেন।
আল-নাহাওয়ান্দী (মৃত্যু ৮৩৫ খৃস্টাব্দের পরে) অন্যান্য বৈজ্ঞানিকের মত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরিক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ফল নিজ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যোজনা না করে স্বয়ং স্বাধীন বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের কার্য তালিকা নিজেই প্রস্তুত করেন।
(একাধিক বিজ্ঞানীর একক মত্য নির্ধারনে পৃথক ব্যবস্থা করণ পদ্ধতি ঈঊজঘ এ অনুস্মৃত হয়) হাতের লেখা
(৫৪)
দামাসকাস ও বাগদাদের মানমন্দিরের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ফলাফল সংরক্ষক। মানমন্দিরে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকের কার্যাবলী বিজ্ঞানসম্মতভাবে লিপিবদ্ধ ও একত্র করে রাখার সমুদয় দায়িত্বভার ছিল তাঁর উপর।
অখ টঘউঊজ খঙইইণ
আল আ-ারলবি। খলীফা আল-মামুনের বিজ্ঞান-সভার অন্যতম সদস্য। বৈজ্ঞানিক গবেষণা কার্যক্রমের মধ্যে জ্যোতিবিজ্ঞান, ভূপৃষ্ঠ পরিমিতি এবং আ-ারলব সম্বন্ধে কয়েকটি মৌলিক পুস্তুক রচনা করেন। তবে তাঁকে বিজ্ঞান জগতে সত্যিকারভাবে অমরত্ব দান করেছেন বিজ্ঞান সম্বন্ধে বিভিন্ন সূক্ষা যন্ত্র নির্মাণ ও উদ্ভাবনের কীতি। জ্যোতিবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয় যন্ত্র নির্মাণকারী হিসাবে তখন তিনি ছিলেন সুবিখ্যাত। তাঁর যন্ত্রপাতি দিয়েই মানমন্দিরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের কাজ চলত।
আবুল-বাইয়াত (মৃত্যু ৮৩৫ খৃস্টাব্দ) বাগদাদের অন্যতম শিল্প স্থপতি। মাশাল্লাহ্র শিষ্য। তিনিও জ্যোতিবিজ্ঞানী ছিলেন এবং এ সম্বন্ধে বহু রচনা করেন। ১১৩৬ খৃস্টাব্দে প্লেট্রো টিওরি তাঁর একটি গ্রন্থ ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। ১১৫৩ খৃস্টাব্দে জোহানেস হিসপালেনসিসও তাঁর আর একটি বই-এর অনুবাদ প্রকাশ করেন। এই অনুবাদটি ১৫৪৬-১৫৪৯ খৃস্টাব্দে ঔড়যড়হহ ঝপযড়হবৎ কর্তৃক সম্পাদিত হয়ে পূনঃ প্রকাশিত হয়। তিনি বিজ্ঞান সম্পর্কিত ছোটখাট আরও অনেকগুলো বই রচনা করেন।
আল-মামুন বিজ্ঞানকে এত ভালবাসতেন যে, মানুষকে আপ্রাণ উৎসাহ অনুপ্রেরণা দিয়ে একটি বিজ্ঞান জামানা সৃষ্টির চেষ্টা করেন।
(৫৫)
খলীফার প্রভাবে ও অনুপ্রেরণায় সে সময়ে বহু বৈজ্ঞানিক আত্মপ্রকাশ করেন। তম্মধ্যে উপরের বিজ্ঞানীবৃন্দ শুধু আধুনিক বিজ্ঞান জগত নয়, পৃথিবীতে যতদিন বিজ্ঞান বেঁচে থাকবে, অন্তত তাঁদের নাম অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আগে বলেছিÑখলীফা মামুনের পূণ্য শাসনের অবদানে বহু খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিকের আবির্ভাব ঘটে। তম্মধ্যে অন্তত একজন যদি পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ না করতেন, তাহলে আজকের আধুনিক বিজ্ঞান বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে থাকত। মামুনের প্রভাবে প্রতিষ্ঠা লাভকারী দুইজন জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানীর একজন হলেন আল ফ্রাগানাস ও ।ন্যজন হলেন মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমী। খাওয়ারিজমী হলেন আধুনিক বীজগণিতের সৃষ্টিকর্তা। তাঁকে মুসলিম নিউটন বলা হয়। তাঁর লেখা ‘এলমুল-জাবর-ওয়াল মুকাবিলা’ গ্রন্থটির নাম সংক্ষিপ্ত করেই উরোপীয়ানরা এর নাম রাখেন ‘এলজাবরা’। টএকে ইউরোপে সাধারণত খাওয়ারিজমীর ‘আল-জাবরা’ বলা হয়। অন্যান্য শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিকের অনুরূপ ইউরোপীয়রা এই দুইজন বৈজ্ঞানিকের নাম পরিচয় বিকৃত করেছেন। তা পূর্ব তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মামুনের পৃষ্ঠপোষকতায় (১)আল খাওয়ারিজমী (২)ফ্রাগা নাম ইউরোপের জাগরণ যুগ
আল-ফ্রাগানাস (মৃত্যু ৮৩৩ খৃস্টব্দের পরে) তিনি জ্যোতিবিজ্ঞানেই বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর রচিত ঊষবসবহঃং ড়ভ অংঃৎড়হড়সু গ্রন্থটি পাশ্চাত্যে বহুল সমাদৃত গ্রন্থ। অল্পদিন পূর্বেও প্রাচ্য জগতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসাবে পরিগণিত ছিল। ছাপাখানা আবিষ্কারের পর ইউরোপে এর ঘন ঘন সংস্করণ হতে থাকে। গ্রন্থটি জিরার্ড এবং জোহানাস দ্য লুনা হিসপালেনসিস ল্যাটিনে অনুবাদ করেন। ইউরোপের জাগরণ যুগে রেজিওমনটেনাস এই অনুবাদ পড়ে মুগ্ধ হয়ে পূর্ণ অনুবাদ করেন এবং ১৪৮৩ খৃস্টাব্দে-মনীষী সেলানকথন রেজিওমনটেনাসের অনুবাদের উপর নির্ভর করে নিউরেসথান হতে জ্যোতিবিজ্ঞানের একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। জোহানেস অনুদিত গ্রন্থটি ১৫৪৬ খৃস্টাব্দে আনাটোল কর্তৃক পূর্ণপ্রকাশ হয়। এই হিব্রু অনুবাদ থেকে জেকব ক্রিস্টসান পুনরায় ল্যাটিনে অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। এই জনপ্রিয় পুস্তকটির অনেক লম্বা আরবী নামÑ‘জামি এলমুল নজুম ওয়াল হরকত আল সামাইয়া’।
(১ম (ক) পর্ব শেষ)
(খ) (২)
(৬৪) আল খাওয়ারিজমি আকাশের মানচিত্র
জ্যোতিবিজ্ঞান ও জ্যোতিষ আলোচনায় সুবিধার জন্যে খলীফা আল-মামুনের অনুপ্রেরণায় অন্যান্য বৈজ্ঞানিকের সম্বন্ধে আল-খাওয়ারিজমী আকাশ ও ভূ-ম-লের মানচিত্র প্রণয়ন করেন। আকাশের মানচিত্র জ্যোতিবিজ্ঞানের তথ্যাদিতে পরিপূর্ণ। ভূ-ম-লের মানচিত্র প্রণয়নকারীর অসাধারণ ভৌগোলিক জ্ঞানের পরিচায়ক। কেবল এলজাবরা নয়, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম ভৌগোলিক মানচিত্র অঙ্কনেরও জনক আল-খাওয়ারিজমী। তাঁর ভূগোল গ্রন্থ ‘কিতাবুস সুরাত আল-আরদ’ পৃথিবীর আকার সম্বন্ধীয় পুস্তক। এই গ্রন্থের পা-ুলিপি এখনও স্ট্রানবার্গে সংরক্ষিত আছে। এর উপর ভিত্তি করেই এইচ, ফন, জিক-প্রাচীন আফ্রিকার মানচিত্র তৈয়ার করেন।
আল-খাওয়ারিজমী সমতল এবং বৃত্তীয় অঙ্কন সম্বন্ধে যে গ্রন্থ প্রণয়ন করেন, তা এখনও ইউরোপের কোন কোন লাইব্রেরীতে পাওয়া যায়। গ্রন্থটি পূর্বতন জ্যামিতির জটিল প্রতিপাদকে সহজসাধ্য করে তুলেছিল বলে বোসোর মন্তব্যে উল্লেখ রয়েছে তিনি বলেন, ত্রিকোনো তিতিক অঙ্ক বর্তমানের এই সরল এবং সহজ পন্থাটি উদ্ভাবন করার জন্যে কার্যকর জ্যামিতি ও জ্যোতিবিজ্ঞান আরবদের নিকট চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকবে।
রৈখিক ও বৃত্তীয় ত্রিভূজের বিশ্লেষণ করবার থিওরীকে তাঁরা ছোট ছোট প্রতিপাদ্য বিষয়ে রূপান্তরিত করেন। তা ছাড়া ঈযড়ৎফং ড়ভ ফড়ঁনষব ড়ৎব এর স্থানে মাইন ব্যবহার করবার নিয়ম প্রবর্তন করে যাদের অনেক ত্রিভূজ বিশ্লেষণ করতে হয়, তাদের কাজ বিশেষভাবেই সংক্ষেপিত ও সহজ করে তোলেন।”১
খলীফা আল-মামুনের মৃত্যুর পরও আল-খাওয়ারিজমী ১৪-বছর জীবিত ছিলেন।
আরব সভ্যতার বিজ্ঞানের অভ্যুত্থান যুগে বাগদাদের খলীফাদেরই কৃতিত্ব প্রথম ও প্রধান। তম্মধ্যে খলীফা মনসুর, হারুনুর-রশিদ ও আল-মামুনÑএই তিনজন খলীফার অবদান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
(৬৫)
পাশ্চাত্যে সর্বাপেক্ষা সুপরিচিত। বিজ্ঞানের সকল শাখাতে তাঁর অগাধ ব্যুৎপত্তি ছিল। অঙ্কশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা, বায়ুবিজ্ঞান প্রভৃতি তখনকার প্রচলিত সমস্ত বিজ্ঞান শাখাই তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ ছিল। এ ছাড়াও দর্শন ও ধর্মশাস্ত্রের পা-িত্যেরই তিনি ছিলেন সমধিক খ্যাতিসম্পন্ন। তিনি কূফা নগরে এক বিখ্যাত সম্ভ্রান্ত আরব পরিবারে জম্মগ্রহণ করেন। তিনি কূফা নগরে জম্মগ্রহণ করলেও জ্ঞান লাভ করেন বাগদাদে। বাগদাদের প-িত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে জ্ঞান আহরণের দিকে বেশী করে ঝুঁকে পড়েন। খলীফা আল-মামুনের ভ্রাতা আল-মুতাসিম বিল্লাহ্র রাজত্বকালেই তাঁর প্রতিভা বিকাশ লাভ কলে।
আল-কিন্দির গ্রন্থাবলীর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তাঁর লেখার ভাষা দুর্বোধ্য কঠিন শব্দ দ্বারা গঠিত ছিল না। সাধারণত দর্শন বিজ্ঞানের ভাষা একটু কঠিনই হয়ে পড়ে। সহজ করে বলতে চাইলেও প্রকাশ ভঙ্গিটা দুর্বোধ্য ও জটিল হয়ে দাঁড়ায়নি কিন্তু তিনি পদার্থ, রসায়ন, দর্শন প্রভৃতির দুর্বোধ্য জটিল প্রসঙ্গও সহজ-সরল ভাষায় প্রকাশ করতে পারতেন। এজন্য আল-কিন্দির গ্রন্থাবলী জনসাধারণের মধ্যে বেশী প্রচার লাভ করেছিল।
আল-কিন্দির এ পর্যন্ত ২৭০টি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া পাওয়া গিয়াছিল। অঙ্কশাস্ত্র, জ্যোতিবিজ্ঞান, জ্যোতিষবিজ্ঞান, জ্যামিতি এবং সংজ্ঞা সম্বন্ধেও তিনি কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। অন্যান্য গ্রন্থের এগুলিও নানা রকম তথ্য ও ঘটনা সমাবেশে সুপাঠ্য। অঙ্কশাস্ত্রের সমস্ত শাখায় গ্রন্থ রচনা ছাড়াও বিজ্ঞানের অন্যান্য বিভাগের মধ্যে পদার্থবিদ্যা ও সঙ্গীত সম্বন্ধে তাঁর প্রণীত বহু গ্রন্থ রয়েছে।
(৬৬) খলীফা আল-মামুন ভারত আরব বৈজ্ঞানিক বন্ধনের স্থাপতি
আগেই বলা হয়েছে খলীফা মামুনের কল্যাণে প্রাচীন দর্শন-বিজ্ঞানের সঙ্গে আরব জ্ঞান মনীষীর বিনিময় বিকাশের সুযোগ ঘটে। খাওয়ারিজমীর মতো প্রতিভাধরের সঙ্গেও তিনি বন্ধুত্বের সুযোগ পান।
সেকালে জ্ঞানের দুর্ভেদ্য জটিলতা ভেদ করতে খাওয়ারিজমী, আল-বিরুনী, বাত্তানী, ইবনে সিনা প্রমুখ জাঁদরেল বৈজ্ঞানিকের মতো সৃজনী প্রতিভার যেমন অভাব ছিল না, তেমনি আল-কিন্দির বিভিন্ন ভাষাজ্ঞান বিশ্বের লুপ্ত জ্ঞানভা-ার পুনরুদ্ধারে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল।
আগেই বলেছি, বিজ্ঞান অপেক্ষা দর্শনেই আল-কিন্দি অধিকতর কৃতিত্বাধিকারী ছিলেন। এজন্যে পাশ্চাত্য তাঁকে ‘ফিলোসফার অব আরব’ অর্থাৎ ‘আরবদের দার্শনিক’ নামে অভিহিত করত।
আর্কিমিডিসের প্রদত্ত গোলক সংক্রন্ত
আর্কিমিডিসের প্রবর্তিত প্রচলিত গোলক সকম্বন্ধে গবেষণা। গোলক সম্বন্ধে অধুনা প্রচলিত যত প্রকার প্রণালী আছে, তার সবগুলি সম্পর্কেই তিনি আলোচনা করেছিলেন অর্থাৎ আধুনিক গোলকে যেসব সূত্রে ব্যবহৃত হয়, তার সর্বপ্রকার সূত্রেরই তিনি উদ্ভাবক। সুতরাং তাঁকে গোলকের স্থপতি বলা হয়।
(৬৭)
অঙ্কশাস্ত্রেও তাঁর অগাধ পা-িত্য ছিল। ত্রৈমাত্রিক সমীকরণের সম্পাদ্যে ত্রিকোনমিতির সাহায্য নেওয়া তখনকার অঙ্কবিদদের কল্পনাতীত ছিল। আল-মাহনী এর প্রথম পথ প্রদর্শক।
গোলক সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে যে বীজগাণিতিক সমীকরণের উদ্ভব হয়েছে, তার সমাধানে তিনি ত্রৈমাত্রিক কোণের চিহ্ন ব্যবহার করেছেন। ত্রিকোনমিতি ব্যবহারের কথা যখন কেউ কল্পনাই করত না, সেই যুগে ত্রিকোনমিতির এরূপ ব্যবহার তাঁর অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় বহন করে।
জ্যামিতি
খলীফা হারুনুর-রশিদের বিশেষ অনুপ্রেরণায় ইউক্লিডের জ্যামিতির ষষ্ঠ খ- আল-হাজ্জাজ বিন ইউসুফ অনুবাদ সমাপ্ত করেন। এবার আল-মাহনী সর্বপ্রথম ইউক্লিডের পঞ্চম ও দশম খ-ের ভাষ্য লিখেন। আর্কিমিডিসের গোলক ও স্তম্ভক সম্বন্ধীয় গ্রন্থাবলীও তিনি অনুবাদ করেন।
(৬৮) (যে বিজ্ঞানীর পরশে অবিজ্ঞানীও বৈজ্ঞানিক হয়ে পড়েন সেই বৈজ্ঞানির নাম মুসা আল-খাওয়ারিজমী)
তিনি ছিলেন ভয়ঙ্কর দস্যু। অর্থের জন্যে লুটতরাজ, নরহত্যা, অসহায় পথিকদের সর্বস্ব লুন্ঠন ও অমানুষিক নির্যাতনই ছিল তাঁর কার্য জীবন। ঘটনাক্রমে আল-খাওয়ারিজমীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়ে যায় এবং খাওয়ারিজমীর পরামর্শে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তাঁর মারফতেই তিনি আল-মামুনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। আল-মামুনের উৎসাহে মুসা বিন শাকীর বিজ্ঞান সাধনায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। খলীফার প্রেরণায় তাঁর দস্যুবৃত্তির ভয়ঙ্কর প্রতিভা বিশ্ব মানব কল্যাণ সাধনায় রূপান্তরিত হয়। প্রতিভা সব সময় শানিত হাতিয়ারের মত। যেখানেই ব্যবহার করা যায়, সেখানেই সুন্দরভাবে ব্যবহৃত হয়। মুসা বিনশাকীর বিজ্ঞানের শুধু পাঠকই রয়ে গেলেন না, অঙ্কশাস্ত্রের জ্যামিতি ও জ্যোতিবিজ্ঞান গবেষণার মৌলিক অবদানের ক্ষেত্রেও ইতিহাসে জীবিত হয়ে রইলেন। বিজ্ঞান জগতে তাঁরপূণ্য অবদান হলো তিনি বিশ্ববিখ্যাত ‘বনি মুসা ভ্রাতৃদ্বয়ের জনক।
খলীফা আল-মামুন তাঁর বিজ্ঞান সভার ইয়াহ্হিয়া বিন আবি মনসুরের হাতে তাঁদের শিক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করেন। শৈশবকাল থেকেই রাজকীয় জ্ঞানী পরিবেশে বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয় সময়কালে বিজ্ঞানের শীর্ষন্তরে আসন লাভ করেন।
তাঁদের ভাগ্য এমনি সুপ্রসন্ন ছিল যে, বলতে গেলে যে সুযোগ সাধারণত রাজপুত্রগণ পেয়ে থাকেন, শৈশব থেকেই তাঁরা প্রায় অনুরূপ রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিলেন। জ্ঞান সাধনায় যেমন তাঁরা চরম বিকাশলাভ করে ছিলেন, তেমনি পর্যাপ্ত ধন সম্পদেও তাঁদের কোন অভাব ছিল না।
তাঁদের বড় ভাই সর্বাপেক্ষা অধিক প্রতিভাশালী ছিলেন। বিজ্ঞানের সর্ব শাখাতেই তাঁর অসামান্য দক্ষতা ছিল। মধ্যম ভাই ছিলেন বৈজ্ঞানিক যন্ত্র প্রস্তুতে সুনিপুণ কুশলী ও যন্ত্র ব্যবহার বিশেষজ্ঞ।
(৬৯)
জ্ঞান আহরণে তাঁরা নিজেদের সমস্ত ধন-সম্পদ নিয়োজিত করেন। নিজেরাও বেরিয়ে পড়েন পূর্বতন জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রাচীর পুঁথি-পুস্তক সংগ্রহ করার জন্যে। তাঁরা গ্রীক, রোম প্রভৃতি সভ্যতার পীঠস্থানগুলো ঘুরে ঘুরে বিপুল গ্রন্থ সংগ্রহ করেন। এরপরও লোক মারফত প্রচুর অর্থব্যয়ে বহু প্রাচীন জ্ঞান-গ্রন্থ সংগ্রহ করেন। বাগদাদে ফিরবার পথে হাররানে ভাগ্যান্বেষী বৈজ্ঞানিক সাবিত ইবনে ফোরার সঙ্গে দেখা হয়।
দ্রাঘিমা ও অক্ষরেখার কেন্দ্রস্থ গ্রীনউইচ তৎকালীন পৃথিবীতে অজ্ঞাত ছিলেন। বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয় অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমার কল্পনা করে লোহিত সাগরের তীরে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর আকার ও আয়তন সঠিকভাবে নির্ণয় করেন।
আরব বৈজ্ঞানিকগণ যখন পৃথিবীর সঠিক পরিধি ও আয়তন আবিষ্কার করে ফেলেছেন, তখন অনারব বৈজ্ঞানিকগণ এত পিছনে যে, পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্ত সমতল না চেপ্টা তাই নিয়েই তাঁরা ব্যস্ত ছিলেন। এমনকি এর শতাধিক বছর পরে ১৪৯২ সালে ইটালীর শাসক গোষ্ঠী, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে-বিজ্ঞানের এমন শুদ্ধ সত্য কথাটি বলায় বৈজ্ঞানিক ব্রুনোকে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করেন। পৃথিবী ঘূর্ণনের মতবাদ সমর্থন করায় গ্যালিলিওকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। ১৬৩৭ খৃস্টাব্দে তিনি কারাগারেই অন্ধ হয়ে যান। তাপর ১৬৪২ খৃস্টাব্দে জেলখানাতেই হতভাগ্য বন্দীর জীবন প্রদীপও চিরতরে নিভে যায়। বর্তমান যুগেও পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক শাখারভ সোভিয়েত কারাগারে গ্যালিলিওর ভূমিকাই পালন করেছেন।
(৭০)
অন্যদিকে ইসলাম এবং তার সভ্যতা এমনি যে, শাকীর নামক দস্যুসরদারকে মনীষী বৈজ্ঞানিক আসনে সসম্মানে স্থান দিয়েছিল। তাঁর তিন পুত্রকে অতি উচ্চস্তরের বৈজ্ঞানিক মর্যাদায় তুলে ধরেছিল। অতি কুৎসিৎ কদাকার ক্রীতদাসী হযরত রাবেয়া বসরীকে মহিলা আউলিয়ার সর্বোচ্চ স্তরে স্থান দিতে কারও উদার মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা স্থানের অভাব পড়েনি। নিগ্রো ক্রীতাদাস বিলালকে তখন মুয়াযযিনের মর্যাদা দিয়েছিল ইসলামী সভ্যতা। একান্ত হালে মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলীকে সম্মানে বুকে জড়িয়ে নিতে বা মসজিদে স্থান দিতে বা একপাতে বসে খেতেও ইসলাম বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।
(৭১)
বস্তুত নিউটন, গ্যালিলিও, কোপার্নিকাসের জম্মের শত শত বছর আগে আরব বৈজ্ঞানিকগণ জম্মগ্রহণ করেন। আধুনিক ইউরোপের গোড়ার দিকে যখন বিজ্ঞান তেমন কোন সূত্র ছিল না, তখন আধুনিক বৈজ্ঞানিকদের সকল সূত্রের মোটামুটি উৎস তো ছিল আরব বিজ্ঞানের সাধনা। অনুসরণ-অনুকরণ নিউটন করতে পাােরন ওমর খৈয়ামকে। ওমর খৈয়ামের তো নিউটনকে অনুসরণ করা সম্ভব নয়।
ইউরোপ এলজাবরা শিখেছিল আল-খাওয়ারিজমীর নিকট। গুরুকে অস্বীকার করার জন্যে ইউরোপে তাঁর নাম রাখা হলো ‘আল-গরিটমি’। সুতরাং মূল কথাতেই আসা যাক।
কিন্তু এই জানা কথাটাই আবিষ্কার করতে বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয়ের দীর্ঘ দিন ধরে সাধনা করতে হয়েছিল।
বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয় চক্রবান থেকে চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধি সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ দ্বারা সঠিক সিদ্ধান্ত নেন। বছরে দুইদিন দিন-রাত সমান থাকে এই দুই দিনই পৃথিবী তার বিষুব রেখা ও আয়নাম-লীর সংযোগ স্থলে অবস্থান করে।
বনি মুসারাই এই তত্ত্ব প্রথম আবিষ্কার করেন। জ্যোতিবিজ্ঞানের একটি মস্তবড় কথা বনি মুসাদের দ্বারা বিশ্বজনগণ প্রথম জানতে পেরেছে।
(৭৩)
বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয় চিকিৎসা, জ্যামিতি, কণিক, পরিমিতি প্রভৃতি সম্পর্কে কতগুলো গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তার একটি গ্রন্থ মিঃ জিরার্ড ------- নাম দিয়ে ল্যাটিনে অনুবাদ করেন। গ্রন্থটিতে পরিমাপ সম্বন্ধে লেখকদের উচ্চস্তরের জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়।
বলবিজ্ঞান ও সাবেক প্রচলিত কার্যবিধির বাইরে নবতর সূক্ষা সূক্ষা কৌশলগত উৎকর্ষমূলক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নির্মাণ ও ব্যবহার পদ্ধতি সম্পর্কে লিখিত বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয়ের গ্রন্থগুলো নব অবদানে সমৃদ্ধ।
গ্রীক বৈজ্ঞানিক হীরোই ছিলেন বলবিজ্ঞানের উদ্ভাবক। এই সময় ‘কুস্তাবিন-লুকা আল বালবেকী’ নামে হীরোর একটি বলবিজ্ঞান গ্রন্থ ‘ওরয়’ আরবীতে অনুবাদ করেন। এই গ্রন্থটি হয়ত ইউরোপের প্রেরণার উৎস হতে পারে। কিন্তু পর্যবেক্ষণ-গবেষণার দ্বারা তারা এ সম্পর্কে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নির্মাণ ও উদ্ভাবন করেন।
জ্যামিতি
জ্যামিতি পূর্ব হতেই মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের গবেষণার বিষয় হিসাবেই চলে আসছিল এবং নতুন আবিষ্কার উদ্ভাবনে সমৃদ্ধ হয়ে চলছিল। কোণকে দ্বিখ-ে বিভক্ত করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন ইউক্লিড। এই দ্বিখ-ন হতে চতুর্থ খ- করা বা তার দ্বিগুণ চতুর্গুণ করা সম্ভব, কিন্তু কোণকে তিন খ-ে বিভক্ত করার জটিলতা ভেদ করতে উচ্চাঙ্গের জ্যামিতিক জ্ঞানের প্রয়োজন। ঈড়হপযড়রফ ব্যবহার করে কোণকে ত্রিখন্ডিত করা সম্ভব কিনা, এ বিষয়েও এই বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয়-ই হয়ত প্রথম পথ প্রদর্শক। বাহুর পরিমাপ ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল বের করার ফরমূলারও তাঁরাই আবিষ্কারক। তাঁদের রচিত জ্যামিতি গ্রন্থে এই ফরমূলাটি রয়েছে।
তাঁর ‘ফারাস্তুন’ নামক একটি বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে গোলকের পরিমাপ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অঙ্ক শাস্ত্রের বিভিন্ন শাখায় এবং জ্যোতিবিজ্ঞানেও তাঁরা বহু গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাঁদের সমুদয় গ্রন্থের সন্ধান আমরা জানি না। তবে প্রত্যেক আরব বৈজ্ঞানিকের হাতে যেসব প্রাচীন সূত্র পড়েছিল, সেই সব সূত্রকে কেন্দ্র করে, নিজস্ব নতুন নতুন উদ্ভাবন ও আবিষ্কার দিয়ে তাঁরা বিজ্ঞানের বিস্ময়কর উন্নতি সাধন করেছিলেন।
(৭৮)
বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয় আল-মামুন ও তৎপরবর্তী খলীফাদের রাজত্বকালে ছিলেন রাজ-জ্যোতিবিদ। আল-মামুনের দ্বারাই তাঁরা প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। এই ধন তাঁরা ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে ব্যয় করেন নি। জ্ঞান সংগ্রহের জন্যে দেশ পর্যটন এবং জ্ঞান বিজ্ঞানে সদ্ব্যয় করেছিলেন। সেকালে রাজকীয় মানমন্দির থাকা সত্ত্বেও বাগদাদে টাইগ্রীস নদীর তীরে নিজেদের বাসভবনে তাঁরা ‘বাবেল তাকে’ নামক একটি নিজস্ব মানমন্দির
প্রতিষ্ঠা করেন এবং ৮৫০ খৃস্টাব্দ থেকে ৮৭০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত তাঁদের মানমন্দিরে ইচ্ছামত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ কার্য সম্পাদনা করেন।
বনি মসাদের জম্ম-মৃত্যুর সঠিক তারিখ বলা যায় না। তবে বড় ভাই আবু জাফর মুহাম্মদ ৮৭২-৭৩ খৃস্টাব্দে মৃত্যুমুখে পতিত হন।
কর্মজীবনে তিনি টাকা ভাঙ্গিয়ে মুনাফা আদায়ের ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু তখন তাঁর দর্শনের মতবাদ বেশ পরিচিত হয়ে মানুষের ধর্মোম্মাদনার জন্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এ নিয়ে আদালতে অভিযোগ উঠে। আদালত তাঁর সমস্ত মত ও দর্শন পরিবর্তনের জন্যে রায় দেন। সাবিত ইবনে কোরা তাঁর আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্যে আদালতের এলাকার বাইরে, সুদূরবর্তী কাফারতুমায় পালিয়ে যান। সেখানে জীবিকার জন্যে চিকিৎসা ব্যবসা শুরু করেন।
এই সময়ে বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয়ের প্রধান আবু জাফর মুহাম্মদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। মুসা ভ্রাতৃত্রয় পূর্বোল্লিখিত গ্রীক প-িতদের বিজ্ঞান গ্রন্থাবলী অনুসন্ধান ও সংগ্রহ করে বাইজান্টাইন পরিভ্রমণ করে বাগদাদের দিকে ফিরছিলেন। সাবিতাকে দেখা মাত্রই বনি মুসাগণ অল্প পরিচয়েই তাঁর অনন্য প্রতিভা বুঝতে পারেন। তাঁরা তাঁকে নিয়ে বাগদাদ চলে আসেন।
(৭৫) মূসা আল খাওয়ারিজমী থেকে মূসা ভ্রাতৃত্রয় সাবিতা ইবনে কোরা মিনাস হুমায়ন ইবনে ইবনে ইসহাক দ্বিতীয় হুমায়ন সাবিত (পৃ: ৯০) ইব্রাহীম ইবনে সিনান (পৃ: ৯০) ইউসুফ আলঘুরী (পৃ: ৯৬) (এগুলো হাতের লেখা)
বাগদাদের নতুন খলীফা মুতাজিদ বিল্লাহ মুসা ভ্রাতৃদের প্রধান আবু জাফর মুহাম্মদের সুপারিশে বৈজ্ঞানিক সাবিতের জন্যে রাজকীয় সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। মুসলিম বৈজ্ঞানিকগণ সাধারণভাবে অঙ্ক ও বিজ্ঞান সম্বন্ধে শিক্ষালাভ করেন। সুতরাং বিজ্ঞানে যারা পরিশেষে বিশেষ পারদর্শী হয়েছিলেন, তাঁরা সাধারণত গ্রীক ভাষায় সুপ-িত ছিলেন। সাবিত ইবনে কোরা গ্রীক এবং সিরিয়ান ভাষায় সুপ-িত ছিলেন। এ জন্যে অঙ্ক-বিশেষভাবেÑজ্যামিতিতে তাঁর বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। তিনি দর্শন ও অঙ্কশাস্ত্রের মৌলিক গবেষণায় বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেন। অঙ্ক ও জ্যামিতিতে তিনি এত সুখ্যাতি লাভ করেন যে, সাধারণভাবে তাঁকে মনে হতো যে, তিনি আরবের শ্রেষ্ঠ জ্যামিতিবিদ।
তাঁর সমসাময়িক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অন্যতম পারদর্শী বৈজ্ঞানিক ইসহাক ইবনে হুনায়ন ইউক্লিডের জ্যামিতির আরবী অনুবাদ করেন।
(৭৬)
আল-খাওয়ারিজমী যেমন বীজগণিতের সমীকরণকে উত্তম রূপে সহজ সুন্দর করে প্রমাণ ও বিকশিত করার জন্যে জ্যামিতিকে যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করেছেন, তেমনি সাবিতও বীজ গাণিতিক সমস্য জ্যামিতিতে ব্যবহার করে জ্যামিতির উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা করেছেন। তাঁর পূর্বে কেউ এমনভাবে জ্যামিতির প্রতিপাদ্যের সমাধানে বীজ গণিতকে ব্যবহার করেন নি।
সাবিত: ত্রিকোনমিতির সার্থক স্থাপতি
জ্যোতিবিজ্ঞানে সাবিত সূর্যের তুঙ্গত্ব, সৌর বছর সূর্য ঘড়ি বা ছায়াঘড়ি প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করেন। ত্রিকোনমিতি সম্বন্ধেও তিনি আলোচনা করেন। বিশেষভাবে পরবর্তী সময়ে আল-বাত্তানীর হাতে ত্রিকোনমিতির যে উন্নতি সাধিত হয়, তাঁর সূত্রপাত করেন সাবিত ইবনে কোরা। সুতরাং এ বিষয়ে তাঁর অবদানও কম নয়।
সূর্যঘড়ি দিয়ে সময় নিরূপণ প্রথম আবিষ্কার হয় মিসরে। মিসরীয় সভ্যতা বিলুপ্ত হওয়ার পর গ্রীক সভ্যতায়ও এই সূর্যঘড়ির কিছুটা প্রচলনও দেখা যায়। কিন্তু মিসর ও গ্রীক সূর্যঘড়ির মধ্যে কোন সামঞ্জস্যা ছিল না। অনুরূপ মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের আবিষ্কৃত ছায়াঘড়ি ছিল। মিসর গ্রীকদের চেয়ে আরো উন্নত ও অভিনব। আল-ফ্রাগানাম ও আল-খাওয়ারিজমীর ছায়াঘড়ি অনুসরণ করেই সাবিত সূর্যঘড়ি সম্বন্ধে আলোচনা করলেও এতে তাঁর কিচুটা নিজস্ব মৌলিক অবদানও ছিল। সাবিত এপোলো নিয়মের কণিক এর পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম খ-ের অনুবাদ করেনও ভাষ্য লেখেন। আকিমিডিস, ইউক্লিড, থিওভেসিস ও টলেমির গ্রন্থসমূহেরও তিনি অনুবাদ করেন।
সাবিত: তুলাদন্ডের স্থাপতি
মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে সাবিতই প্রথম তুলাদন্ড সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করেন এবং এই সম্বন্ধে তিনি পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। এই সময় বান মুসা ভ্রাতৃত্রয়ও তুলাদ- সম্বন্ধে বই লিখেন। সাবিতের তুলাদ- সংক্রান্ত বইটি জিরার্ড ল্যাটিনে অনুবাদ করেন। জিরার্ড জোহানেস সাবিতের বহু পুস্তুক ল্যাটিনে অনুবাদ করেন।
আবুল মাশার ছিলেন একজন অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক। তাঁকে বিজ্ঞানের যাদুকর বলাই সঙ্গত। এই শ্রেণীর বৈজ্ঞানিক আরব সভ্যতায় প্রায়ই দেখা যেত।
(৭৭)
যেমন আল-বিরুনী, ইবনে সিনা, নাসিরউদ্দীন তুনী প্রমুখ। আবুল মাশারের মত এমন এক আশ্চর্য বৈজ্ঞানিক আধুনিক সভ্যতায় একজনও খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আসামী ধরার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির স্থপতি আবুল মাশার:
সেই অযোগ্য নৃপতি সেই সাধনাকে আসামী ধরার কাজে ব্যবহার করতেন। উচ্চস্তরের রাজকীয় আসামীগুলোকে বৈজ্ঞানিক মাশার তা অঙ্ক কষে গুণে আসামী কোন্ জায়গায় পালিয়ে আছে বলে দিতেন। তদনুসারে রাজ-কর্মচারীরা তাকে ধরে নিয়ে আসত। তখনকার রাজদ্রোহীরা জানত যে, সরকারের চোখে ধূলি দেওয়া যায়, কিন্তু মাশারের গণনার কবল থেকে রেহাই পাওয়া যায় না।
যা হোক, রাজরোষে পতিত জনৈক উচ্চশ্রেণীর ভদ্রলোক মাশারের গণনার কবল থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে আত্মগোপনের এমন এক অভিনব পন্থ উদ্ভাবন করলেন যে, জ্যোতিবিদ কোন অবস্থাতেই তাকে ধরতে পারলেন না। জ্যোতিবিজ্ঞানী গুনে দেখলেন, আসামী এক রক্তের সাগরের মধ্যে অবস্থিত সোনার পাহাড়ে বসে আছেন। বারবার গুণে দেখলেন, গণনার নির্ভুল ফল এছাড়া আর কিছুই হয় না। তখন খলীফা এমন অদ্ভুত আত্মগোপনের রহস্য উদঘাটনের জন্যে আসামীকে ক্ষমা ঘোষণা করে তাঁকে অচিরেই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্যে নির্দেশ দিলেন। আসামী খলীফার নিকট উপস্থিত হলে খলীফা কৌতুহলী হয়ে তাঁর আত্মগোপনের বিবরণ জানতে চাইলেন।
আসামী জানালেন যে, তিনি জানতেন, মাটির উপরে নীচে যেখানেই থাকা যাক, মাশারের গণনায় তিনি ধরা পড়বেনই।
(৭৮)
তখন তিনি একটি সুবৃহৎ টবকে কানায় কানায় রক্ত দ্বারা ভর্তি করে তার মাঝখানে একটি স্বর্ণখ-িত আসনে বসে থাকতেন। এমন নির্ভুল জ্যোতিষবিজ্ঞানী বর্তমান সভ্যতায় বিরল। বিশেষ করে জ্যোতিষ বিজ্ঞানটা প্রায় লুপ্ত হওয়ার পথেই চলছে। অধ্যাত্ম ও জ্যোতিষবিজ্ঞান একন কতগুলো ভ- প্রতারকের প্রতারণা ও ভ-ামীর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জ্যোতিবিজ্ঞানের উন্নত স্তরটিই হলো জ্যোতিষবিজ্ঞান। আমরা জ্যোতিবিজ্ঞান নিয়েই আত্মসন্তুষ্ট আছি, জ্যোতিষ বা ফলিত বিজ্ঞান যে আমাদের কোন কাজে লাগে-এমন মনে হয় না।
অথচ ঠিকমত আয়ত্তে আনতে পারলে মানব জাতির প্রয়োজনে জ্যোতিবিজ্ঞানের মতই জ্যোতিষবিজ্ঞানও প্রচুর অবদান রাখতে পারে।
(হাতের লেখা) স¤্রাট দিনে রাতে জ্যোতিবিজ্ঞানী ধর্ম সাধক থেকে বিজ্ঞান সাধক।
দিনে যিনি মুসলিম স¤্রাট, রাত্রে সাধারণ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিলেমিশে সুবোধ শান্ত জ্যোতিবিজ্ঞানী। আকাশের তারকা নিয়ে নিবিষ্ট গবেষণায় বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন।
আবুল মাশার প্রথমত ধর্মশাস্ত্রের পর্যালোচক ছিলেন। তার পর হাদীস শরীফের টীকা লিকে তিনি প-িত সমাজে সুপরিচিত হন। ৪৭ বছর বয়সে তিনি বিজ্ঞান সাধনা শুরু করেন। সাধারণত মানুষ তরুণ বয়সে ধর্ম সাধনা না করে পরিপক্ক বয়সে ধর্ম সাধনা করে। তিনি তাঁর বিপরীতভাবে প্রথম বয়সে ধর্ম সাধনা করে, পরিক্ক বয়সে বিজ্ঞান সাধনা শুরু করেন। আল-কিন্দির অনুপ্রেরণাই তাঁর বিজ্ঞান সাধনায় মনোযোগের প্রধান কারণ। তিনি আল-কিন্দির শিষ্য ছিলেন। অঙ্কশাস্ত্রের মধ্যে তাঁর জ্যোতিষবিজ্ঞানেই অনুরাগ ছিল বেশী।
(৭৯)
আবুল মাশার বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সব গ্রন্থের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। নি¤েœ কয়েকটি গ্রন্থের পরিচয় প্রদান করা হলো ঃ
১. ‘কিতাবুল মদখল আল-কবির’ বা ‘কিতাবুল মদখবুল ইলা ইলম আহকাম আন-নজুম’ (জ্যোতিষ উপক্রমণিকার বৃহৃৎ পুস্তক)। গ্রন্থটি জোহানেস দ্য-লুনা ও হারমানাগ ল্যাটিনে অনুবাদ করেন। অক্সফোর্ডে এর পা-ুলিপি সংরক্ষিত আছে। ১৩৮৯ খৃস্টাব্দে অগসবাগ এবং ১৪৯৫ ও ১৫০৯ খৃস্টাব্দে ভেনিস থেকে পুনঃ প্রকাশিত হয়। তখন ইউরোপে এ গ্রন্থ বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। কারণ এতে সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা সংক্রান্ত জ্যোতিষ সূত্রগুলি ছিল খুবই নির্ভুল।
২. ‘কিতাবুল কিফানাত’ (নক্ষত্রাদির অবন্থান সম্পর্কিত পুস্তিকা) প্যারিস ও অক্সফোর্ডে পা-ুলিপি সংরক্ষিত আছে।
৩. ‘কিতাবুল আহকামে সিমিল মাওয়ালিদ’। (জম্ম বছরের পরিবর্তনমূলক পুস্তিকা) এ গ্রন্থ ল্যাটিনে অনুদিত হয়।
৪. ‘কিতাবুল উলুফ কি বায়তুল ইবাদাত’ (ধর্ম গ্রন্থ সম্বন্ধীয় সহ¯্র কাহিনী। পৃথিবীতে যত ধর্মগ্রন্থ ও সৌধ নির্মাণ করা হয়েছে তার বিশদ বর্ণনা। আল-বিরুনীর প্রাচীন বিজ্ঞান গ্রন্থাবলীতে এ পুস্তুকের উল্লেখ আছে।
৫. ‘কিতাবুল মাওয়ালিদ আর-রিজাল ওয়ান-নিসা’। বালিন, ভিয়েনা ও ফ্লোরেন্স থেকে প্রকাশিত ‘জম্ম পুস্তক’ গ্রন্থটি মাশারেরই অবদান বলে মনে করা হয়।
৬. অগস্বাগ থেকে প্রকাশিত দঞযব ঋষড়ৎবং অষনড়সধংধৎরং’ নামক একটি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু এর আরবীনাম পাওয়া যায়নি।
(৮০) ভারতীয় পদ্ধতি
দ্বিতীয় আল-খাওয়ারিজমী। অঙ্কশাস্ত্রে তাঁর অগাধ পা-িত্যের জন্য আরব বৈজ্ঞানিকগণ তাঁকে ‘হাবাশ আল-হাসিব’ নামে অভিহিত করতেন। তিনি তিনটি খগেলে তালিকা প্রস্তুত করেন। প্রথমটি প্রণীত হয় ভারতীয় পদ্ধতিতে। দ্বিতীয়টি নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা।
যেসব আরব বৈজ্ঞানিক বিখ্যাত বলে ইউরোপে সুপরিচিত, তাঁদের চেয়ে কম পরিচিত কয়েকজন বৈজ্ঞানিকের পরিচয় নি¤েœ প্রদান করা হলো ঃ
আজীবন গ্রামে বাস করেও তিনি বিজ্ঞানের সাধনায় যে অবদান রেখে গেছেন, শহর বা নগর সভ্যতার উন্নত সুযোগ সংস্পর্শে বা রাজকীয় সহায়তা পেলে হয়ত তাঁর বিজ্ঞান সাধনা আরো বিস্ময়করভাবে বিকাশ লাভ করতে পারত। তিনি বীজগণিত, জ্যোতিবিজ্ঞান ও হিন্দু গণনা প্রণালী সম্পর্কে কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
ইহুদী
সহল ইবনে বিশর ঃ তিনি য়াহূদী হয়েও নিজ প্রতিভা বলে বাগদাদের রাজসভায় মুসলমান বৈজ্ঞানিকদের সমপদমর্যাদা লাভ করেন এবং জ্যোতিবিজ্ঞান ও বীজগণিত সম্বন্ধে কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
(৮১)
তিনি খুরাসানে জ্যোতিবিজ্ঞানে প-িত ব্যক্তি হিসাবে বিখ্যাত ছিলেন।
সহল ইবনে তারারী ঃ তিনিও একজন য়াহূদী বৈজ্ঞানিক, জ্যোতিবিজ্ঞান সাধনা করে এবং আল-মাজেস্টের আরবী অনুবাদ করেন।
সনদ ইবনে আলী (মৃত্যু ৮৬৪ খৃস্টাব্দ) ঃ তিনি প্রথমে য়াহূদী ছিলেন। পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং জ্যোতিবিজ্ঞানের উপর কতগুলো মূল্যবান প্রবন্ধ প্রণয়ন করেন। ত্রিকোনমিতি প্রভৃতি অঙ্কশাস্ত্র ছাড়াও তিনি পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন।
আল-হাজ্জাজ (মৃত্যু ৮৩৫ খৃস্টাব্দ) ঃ তিনি সর্বপ্রথম ইউক্লিডের সমস্ত গ্রন্থের অনুবাদ করেন। তাঁর এই অনুবাদ কর্ম প্রথমত খলীফা হারুনুর-রশীদ এবং দ্বিতীয়বারে খলীফা আল-মামুনের আনুকূল্যে কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়। বিশেষভাবে তাঁরই অনুবাদের মারফত আরব বৈজ্ঞানিকগণ শুদ্ধ জ্যামিতির সংস্পর্শে
আসেন। ৮২৯-৩০ খৃস্টাব্দে তিনি সর্বপ্রথম টলেমির আল-মাজেস্ট ‘কিতাব আল-সাজিগতি’ নাম দিয়ে আরবী ভাষায় অনুবাদ করেন। বর্তমান পৃথিবীতে ‘আল-মাজেস্ট’ নামক আরবী নামটি তাঁরই প্রবর্তিত।
আল-আব্বাস ঃ ৮২১ থেকে ৮৩৩ খৃস্টাব্দে বাগদাদের মনমন্দিরে আন্তারলবী প্রমুখ বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে গবেষণা কার্যে নিয়োজিত ছিলেন। ইউক্লিডের জ্যামিতির তিনি ভাষ্য রচনা করেন।
হুসায়ন ইবনে ইসহাক ( ৮০৯-৮৭৩) ঃ ইরাকের হীরা নগরীতে তিনি এক অভিজাত পরিবারে জম্মগ্রহণ করেন।
(৮২)
এজন্যে অতি অল্প বয়সেই শিক্ষার ও প্রতিভা বিকাশের রাজকীয় সুযোগ পান। আরবের তৎকালীন অনুবাদকারী বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে তাঁকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলা যেতে পারে। যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৭ বছর, তখনই তিনি কতগুলো গ্রীক বিজ্ঞান গ্রন্থ সিরিয়ান ও আরবী ভাষায় অনুবাদ করে ফেলেন।
তাঁর জীবনের পরম সৌভাগ্য এই যে, অতি অল্প বয়সে তিনি বনি মসিা ভ্রাতৃত্রয়ের সংস্পর্শে আসেন। তাঁদের নির্দেশে তিনি প্রথম জীবনেই প্রাচীন বিজ্ঞান গ্রন্থের পা-ুলিপি সংগ্রহের কার্যে ব্রতী হন। এই থেকেই তাঁর অনুবাদ কার্যের অসাধারণ অনুরাগ সৃষ্টি হয়।
খলীফা হারুনুর-রশীদ যে বছর মৃত্যুমুখে পতিত হন, সেই বছর তিনি জম্মগ্রহন করেন এবং খলীফা আল-মামুন যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন বৈজ্ঞানিক হুসায়নের বয়স ২৪ বছর। সুতরাং তাঁর জীবনোম্মেষের প্রাক্কালেই তিনি একজন বিজ্ঞানব্রতী খলীফার সংশ্রবে আসেন। বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয় ও খলীফা আল-মামুনের আনুকুল্যে তাঁর বিজ্ঞানী জীবনের ১৪ বছর অতিবাহিত হওয়াটা তাঁর জন্যে সৌভাগ্যই ছিল বলতে হবে।
আমরা এখন এমন একজন আব্বাসীয় খলীফার নাম বলব, যার নিষ্ঠুর শাসনে আব্বাসীয় বংশের পতনের সূচনা ঘটে। কিন্তু সেই নিষ্ঠুর খলীফা মুতাওয়াক্কিলও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অতিশয় মহান ও উদার ভূমিকা পালন করে গেছেন।
রাজ্য শাসনে নিষ্ঠুরতা সত্ত্বেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি য়াহূদী, খৃস্টান, হিন্দু বিজ্ঞানীদের প্রতি পরম শ্রদ্ধা পোষণ করতেন এবং তাঁদের খুঁজে এনে তাঁর রাজদরবারে স্থান দিতেন।
(৮৩) আরব বিজ্ঞান জগতের চাঁদ হেলাল (হাতের লেখা)
বিদেশী জ্ঞানবিজ্ঞান গ্রন্থগুলো আরবী ভাষায় অনুবাদ করে জনগনের মধ্যে সহজবোধ্য করে তোলার জন্যে তিনি একটি অনুবাদ কার্যালয় স্থাপন করেন এবং এর দায়িত্ব অর্পন করা বৈজ্ঞানিক হুসায়নের উপর। হুসায়ন যথাসাধ্য যতœ সহকারে তাঁর বৈজ্ঞানিক সততা রক্ষার চেষ্টা করেন। খুব ভাল পা-ুলিপি সংগ্রহ করা, মূল ঊন-এর সাথে যাতে অনৈক্য না থাকে, এজন্যে অনুদিত পুস্তক স্বয়ং সতর্কভাবে পরীক্ষা করে দেখে দেওয়া ইত্যাদি কার্যে তিনি তাঁর কর্তব্য বিশেষভাবে সম্পাদন করতেন। তিনি অন্যের উপর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চেষ্ট থাকতেন না। নিজেও অসাধারণ কর্মতৎপর ছিলেন। তাঁর অনুবাদ আন্দোলন আরব বিজ্ঞান জগতে অসাধারণ প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
তিনি নিজে ৯৫টি গ্রন্থ সিরিয়ান এবং ৩৯টি গ্রন্থ আরবী ভাষায় অনুবাদ করেন। গ্যালেন, এরিস্টটল, ডিস কোরাইডিস, টলেমি প্রমুখের অনুদিত গ্রন্থগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ! চিকিৎসক হিসাবে তাঁর চিকিৎসাশাস্ত্রীয় অনুবাদ গ্রন্থগুলিও ছিল অত্যন্ত মূল্যবান।
অনুবাদ বাদে তাঁর নিজস্ব অবদানও ছিল অনন্য। চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতিবিজ্ঞানে জোয়ার ভাটা, উল্কাপাত, রংধনু নিয়ে তিনি ব্যাপক পর্যালোচনা করেন।
ইসহাক ইবনে হুসায়ন (মৃত্যু ৯১০ খৃস্টাব্দে) ঃ হুসায়নের পুত্র দ্বিতীয় হুসায়ন। তিনি পিতার মতই বিজ্ঞানানুরাগী ছিলেন। ইউক্লিডের জ্যামিতি, ড্যাটা, আল-মাজেস্ট গোলক, ম্যানিলসের ঝঢ়যবৎরবং আরবীতে অনুবাদ করেন। এরিস্টটল প্রমুখের কয়েকটি গ্রীক দার্শনিক গ্রন্থও আরবীতে অনুবাদ করেন। গ্রীক এবং আরবী এই দু’টি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ও জটিল ভাষায় তাঁর ছিল অগাধ পান্ডিত্য।
(৮৪)
আল-ফজল (মৃত্যু ৮১৫-১৬ খৃস্টাব্দ) ঃ রাজ-জ্যোতিষী ইর-বখতের পুত্র। এক সময় তিনি খলীফা হারুনুর-রশীদের লাইব্রেরীয়ান ছিলেন। সেখানে থেকেই তিনি বিজ্ঞান গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। খলীফার আদেশে বহু পারসী বিজ্ঞান গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন। জ্যোতিবিজ্ঞান ও জ্যোতিষ শাস্ত্র সম্বন্ধেও তিনি কতগুলো গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তাঁর একটি জ্যোতিষ গ্রন্থ জিরার্ড ল্যাটিনে অনুবাদ করেন। এই অনুদিত গ্রন্থের ল্যাটিন নাম হলো, দখরনবৎ অষভধফযধষ-র-বংঃ ধৎধনব ফব নবপযর’।
আহমদ ইবনে ইউসুফ (মৃত্যু ৯১২ খৃস্টাব্দ) ঃ তিনি জ্যোতিবিজ্ঞান, চৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হ সমৃন্ধে কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এই বইটি ইউরোপের রেনেসাঁয় খুবই প্রভাব বিস্তার করেছিল। ইটালীর প-িত লিউনার্দো ও জউপাসের ল্যাটিন অনুবাদের মারফতেই ইউরোপে এটি ব্যাপক প্রচার-প্রসার লাভ করে। তিনি ম্যানিলসের ত্রিভূজ খ-ন সম্পর্কিত উপপাদ্য প্রভৃতি সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করেন। টলেমির একটি পুস্তকের ভাষ্যও তিনি লিখেন।
(হাতের লেখা) ইউরোপের বিজ্ঞান পূর্ণজাগরণে আহমদ ইবনে ইউসুফ
(৮৫) ইউরোপের পূর্ণজাগরনে বাত্তানী
খলীফা মুতওয়াক্কিলের মৃত্যুর সময় তাঁর বয়ঃক্রম মাত্র ৫ বছর। এর পরই ঘন ঘন ক্ষমতার উত্থান-পতন ও খলীফা রদ-বদলের মধ্য দিয়ে আব্বাসী বংশের পতন-যুগ শুরু হয়। তা সত্ত্বেও কোন খলীফাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি উদাসীন ছিলেন না। জ্ঞান সংগ্রহ ও জ্ঞানী-গুণীদের কদর দান তাঁদের নেশায় পরিণত হয়ে পড়েছিল।
(গভর্নর থেকে বৈজ্ঞানিক)
বাত্তানীকে অতি তরুণ বয়সেই খলীফা কর্তৃক সিরিয়ার গভর্নর পদে অধিষ্ঠিত হতে হয়। তবু তিনি রাজকার্যে ব্যাপৃত থেকেও বিজ্ঞান সাধনার ক্ষতি করেন নি এবং জ্যোতিবিজ্ঞান
ও ত্রিকোনমিতির ক্ষেত্রে নব নব উদ্ভাবনীর স্বাক্ষর রাখেন এবং রাজধানী এস্টিয়োক ও য়াক্কা থেকে জ্যোতিবিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কার্য চালাতেন। তিনি অক্ষরমালাকে সংখ্যার প্রতীক হিসাবে ব্যবহারমূলক একটি ‘জিজ’ তালিকা তৈরী করেন। এটি ইউরোপীয় প-িতের দ্বারা অনুদিত হয়ে ৩ খ-ে প্রকাশিত হয়।
জ্যোতিবিজ্ঞান তালিকা, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র প্রভৃতির গতি প্রকৃতি, গ্রহণ ও সৌরজগত সম্বন্ধে তাঁর সঠিক তথ্য কেবল অভিনবই নয়, জ্যোতিবিজ্ঞানে পূর্বতন বৈজ্ঞানিকদের বহু ভুলও তিনি সংশোধন করেন।
(৮৬)
টলেমি ও হিপারকাশ নক্ষত্রের খড়হমরঃঁফরহধষ সড়ঃরড়হ সম্পর্কে যে ভুল করেছেন, তা দেখিয়ে দেন।
বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয়ই সর্বপ্রথম সূর্যের অক্ষগতি (অপভূ-অনুভূ) সম্পর্কে সঠিক তথ্য আবিষ্কার করেন। বাত্তানী নতুনতর যন্ত্রপাতির সহায়তায় পর্যবেক্ষণ করে প্রমাণ করেন যে, সূর্যের অক্ষগতি সম রাত্রি দিনের প্রাগায়নের উপর এতে মুসা ভ্রাতৃ মতবাদ আরো অভ্রান্ত ও জীবন্ত হয়ে উঠে এবং এতদিনকার সূর্য সম্পর্কে টলেমির প্রতিষ্ঠিত মতবাদ নস্যাৎ হয়ে যায়।
বাত্তানীই প্রথম ত্রিকোনমিতির সম্পূর্ণ স্বাধীন স্বরূপ আলোচনায় প্রবৃত্তও হন।
(৮৭)
এ যে একটি স্বয়ং স্বাধীন বিজ্ঞান একথা প্রথম আবিস্কার করেন আল-বাত্তানী। বৈজ্ঞানিকগণ এতদিন এর প্রতি অমনোযোগী ছিলেন। বাত্তানীর অসাধারণ প্রতিভার স্পর্শে নির্জীব ত্রিকোনমিতি সজীব হয়ে ফুঠে উঠে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিকগণও বাত্তানীর নব অবদান প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে এদিকে ক্রমশ ঝুঁকে পড়তে থাকেন।
সাইন, কোসাইন ট্যানজেন্ট, কো-ট্যানজেন্ট প্রভৃতি ত্রিকোনমিতির সহজ সুন্দর সাংকেতিক নিয়মগুলো ব্যবহার উপযোগী বৈশিষ্ট্যময় করে ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারটা বাত্তানীর পূর্বে কেউ ভাবতেও পারেন নি। ত্রিকোনমিতির সমস্যা সমাধানে টলেমি ঈযড়ৎফং ব্যবহারে যে উপপাদ্যের সাহায্য নিয়েছিলেন, তা এমন জটিল ও দুর্বোধ্য ছিল যে, মানুষ তা অর্থহীন মনে করে এর ধারে কাছেও আসতে চাইত না। বাত্তানী ত্রিকোনমিতিতে আরবী শব্দ ‘জাইব’ (বক্র) ব্যবহার করেন। জাইবের ল্যাটিন অনুদিত অর্থ ‘ঝরহঁং’ থেকেই ‘ঝরহব’ (সাইন) শব্দের উৎপত্তি হয়। আরবদের আবিষ্কৃত ছায়াঘড়ির উপরের সমতলস্থ ছায়ার ধারণা থেকে কোট্যানজেন্ট এবং উপরস্থ ছায়ার ধারণা থেকে ট্যানজেন্টের শাব্দিক অবয়বের উদ্ভব হয়। অর্থাৎ ত্রিকোনমিতির এই শব্দগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার বৈশিষ্ট্য আবিষ্কারের গোড়ায় রয়েছেন আল-বাত্তানী ! সাইন, কোসাইনের সঙ্গে ট্যানজেন্টের সম্পর্ক বাত্তানীই প্রথম আবিষ্কার করেন। ত্রিভূজের বাহুর সঙ্গে কোণের ত্রিকোনমিতিক সম্বন্ধও তাঁরই আবিষ্কার।
যে ৪টি গ্রন্থ তাঁর পরিচয় বহন করে,
১. “কিতাব মারেফাতে মাতালী আল-বুরুজ ফি মা বায়না আরবা আল ফালাক” ।ংকের সাহায্যে জ্যোতিবিজ্ঞানের সমাধান।
২. ‘রিসালা ফি তাহকিক আবদার আল-ইল্লিসালাত’-এ গ্রহ নক্ষত্রাদির গতিবিধি সম্পর্কে ত্রিকোনমিতিক সমাধান।
(৮৮)
৩. ‘সাবাহ আল-মাকালাত আল-আরবা লিকাতমিয়াম’ টলেমির টেট্রাবিবলসের ভাষ্য।
৪. ‘আজ-জিজ’ জ্যোতিবিজ্ঞান গ্রন্থ ও তালিকা । উল্লিখিত বই গুলোর মধ্যে এই বইটিই সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বশ্রেষ্ঠ। এই গ্রন্থটি প্লেটো টিবারটিলুজ ও রেজিওমন্টেনাস কর্তৃক ল্যাটিনে অনুদিত হয়। বাত্তানী আর্যভট্ট ও ব্রহ্মগুপ্তের ত্রিকোনমিতির সঙ্গে অপরিচিত ছিলেন। এতে তাঁর নিজস্ব অবদান বৈশিষ্ট্য ছিল সমধিক।
এই গ্রন্থটি শুধু যে আরব বৈজ্ঞানিকদেরকেই অনুপ্রানিত করেছিল তাই নয়, ইউরোপের নবজাগরণে এই পুস্তকটি প্রভাব বিস্তার করেছিল। এর প্রমাণ হিসাবে বলা যেতে পারে-ক্যাস্টাইলেব দশম আলফালনো এর ল্যাটিন অনুবাদে তুষ্ট না হয়ে মূল আরবী থেকে স্পেনীয় ভাষায় পুনরানুবাদ করেন।
(হাতের লেখা) চিকিৎসা বিজ্ঞান রসায়নের স্থপতি
(৮৯)
বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তাঁর প্রথম ছিল না। ঘটনা বৈচিত্র্যে প্রয়োজনের তাগিদে ক্রমান্বয়ে তিনি এদিকে ঝুঁকে পড়েন। প্রথমত চিকিৎসক ও চিকিসাবিজ্ঞানী হিসাবে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দান করে, দেশ-বিদেশে তরুণ বয়সেই াতি দ্রুত সুবিখ্যাত হয়ে পড়েন। চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকেই তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি অনুরক্তি শুরু হয়।
দুটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। তৎকালে বাগদাদে এক অভিনব রোগ দেখা দিলে বাগদাদ হাসপাতালের চিকিৎসকগণ গেন রোগের এক অদ্ভুত নিরাময় পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।
এতে তিনি চমৎকৃত ও কৌতুহলাক্রান্ত হয়ে ডাক্তারদের নিকট সবিস্তারে তা জেনে নেন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে উৎসাহিত হন। দ্বিতীয়ত একবার রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বিষাক্ত গ্যাস শরীরে প্রবেশ করলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে তিনি তখন জনৈক অভিজ্ঞ হেকিমের শরণাপন্ন হন। তাঁর আরোগ্যলাভ দ্রুত হয় বটে, কিন্তু হেকিম সাহেব তাঁর নিকট সাড়ে ৩ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দাবী করেন। বিষয়টি তার মনে ভাবান্তর ঘটায়। অতঃপর তিনি চিকিৎসা ব্যবসায়ে এত খ্যাতি অর্জন করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ্র চিকিৎসার জন্যে সদাসর্বদাই তাঁকে বিভিন্ন স্থানে গরে বেড়াতে হতো।
প্রথমই তিনি রাইর সুলতানের রাজকীয় চিকিৎসক নিযুক্ত হন এবং তাঁর হাসপাতালের অধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
রাযী তখনকার মুসলিম জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসাবে সুবিখ্যাত ছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর উদ্ভাবিত অনেক অবদান এখনও সযত্বে ব্যবহৃত হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর বহু গ্রন্থ প্রামাণ্য হিসেবে সমাদৃত হয়। রসায়নশাস্ত্রে তিনি অনেক নতুন বিষয় প্রবর্তন করেন। তম্মধ্যে প্রতীক চিহ্নাদি অন্যতম। তাঁর বর্তমান রসায়নশাস্ত্রের অন্যতম প্রবর্তকও বলা যেতে পারে। অঙ্কশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখাতে তিনি সুদক্ষ ছিলেন। জ্যোতিবিজ্ঞান, জ্যামিতির উপরেও কয়েকটি পুস্তক প্রণয়ন করেন। বল-বিজ্ঞানের, ওজন সম্বন্ধীয়
(৯০) হাতের লেখা ঝবধৎপয আর্কিমিডিস এর জম্ম / কর্ম সাল কবে ?
মিনাস ইবনে সাবিত ছিলেন সাবিত ইবনে কোরার পুত্র। ইবনে সাবিতও পিতার ন্যায় চিকিৎসা বিদ ছিলেন। অতি অল্পকালেই তিনি উচ্চস্তরের চিকিৎসক বিখ্যাত হয়ে পড়েন। এজন্য খলীফা আল-মুতাকিদ তাঁকে আল-কাহিরও আর-রাষীর চিকিৎসক নিযুক্ত করেন।
তিনি তাঁর যোগ্য সদস্য হিসাবে প্রায় ৮০০ শত চিকিৎসককে ডিপ্লোমা প্রদান করেন। পিতার ন্যায় তিনি জ্যামিতি ও জ্যোতিবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে অনন্য সাধারণ অবদান রেখেছিলেন। আর্কিমিডিসের কতগুলো পুস্তক তিনি সিরিয়ান ও আরবী ভাষায় অনুবাদ করেন।
তিনি সাবিত ইবনে সিনানের পুত্র এবং সাবিত ইবনে কোরার পৌত্র। পিতা ও দাদার ন্যায় তিনিও ছিলেন পেশায় চিকিৎসক। এতদসত্বেও তিনি বিজ্ঞান নিয়ে সদা নিমগ্ন থাকতেন। কণিক ও সূর্যঘড়ি প্রস্তুত সম্বন্ধে কয়েক খ- গ্রস্থ প্রণয়ন করেন। কণিকে প্রথম পুস্তুকের এবং আল-মাজেস্টের ভাষ্য লিখেন।
অংক বিজ্ঞানের উন্নত সংস্করণ
অধিবৃত্তের সমপরিমাণ বিশিষ্ট বর্গ ক্ষেত্রফল বের করতে তিনি যে প্রণালী আবিষ্কার করেন, অঙ্কশাস্ত্রে তা উচ্চস্তরের অবদান।
(৯১)
তিনি এরিস্টটলের বহু গ্রন্থের ভাষ্য লিখেন। তম্মধ্যে পদার্থবিদ্যা, ভূ বিদ্যা, জ্যোতিবিজ্ঞানের গ্রন্থগুলো সুপ্রসিদ্ধ। টলেমির আল-মাজেস্টেরও তিনি ভাষ্য লিখেন। ডিটিরিয়াসের মতে, তিনি আরো আট-দশটি গ্রন্থ-লিখেন। তম্মধ্যে ‘বিজ্ঞান রতœ’ (রিসালা ফুমাস আল-হিকাম) ‘আদর্শ নগরী’ (রিসালাদি আরা আহলোন মদীনা ওয়া আল-ফাজিনা) ‘বিজ্ঞান বিশ্বকোষ’ (কিতাব ইহ্ইয়া আল উলুম বা ঊহপুপষড়ঢ়ধবফরধ ড়ভ ঝপরবহপব সর্বপেক্ষা প্রসিদ্ধ।
এই সময় আলেপ্নোর বাদশাহ্ সাইফুদ্দৌলা তাঁর গুণগান শুনে রাজ দরবারে ডেকে এনে আজীবন সভাসদ হিসাবে গ্রহণ করেন।
(৯২)
অঙ্কশাস্ত্রের জ্যামিতির প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল। তিনি আল-বাত্তানীর সমসাময়িক ছিলেন। বাত্তানীর প্রভাবে তিনি জ্যোতিবিজ্ঞান সহ বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার দিকেও ঝুঁকে পড়েন।
তিনি জ্যামিতির উপরে মৌলিক অবদানমূলক বহু প্রবন্ধ লিখেন এবং ইউক্লিডের ভাষ্য, গ্রন্থ রচনায় তাঁর জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। জিরার্ড এই গ্রন্থটির ল্যাটিন অনুবাদ করেন এবং ইউরোপের জ্যামিতি জগতে এই গ্রন্থটি ইউরোপের নব জাগরণে অসামান্য প্রভাব বিস্তার করে। টলেমির ভাষ্য গ্রন্থ প্রণয়নও এই মনীষীর অন্যতম কীতি। আল-মুতাজিদের উৎসাহে তিনি নৈসর্গিক ঘটনা বিচিত্র বর্ণনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার উপর একটি চমৎকার গ্রন্থ রচনা করেন। সূর্যঘড়ি ও ত্রিকোনমিতি নিয়েও আল-ফারাবী গবেষণা করেন। এবং গোলকার আন্তারলব সম্বন্ধে অত্যন্ত মূল্যবান ৪ খ-ে সমাপ্ত একটি বৃহৎ পুস্তক প্রণয়ন করেন। আরবী ভাষায় এই গ্রন্থটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এই গ্রন্থটি কিছুদিন পূর্বে জার্মান ভাষায় ।নুদিত হয়। এই অনুবাদ গ্রন্থটির নাম ঝপযড়ু অনযধঁফষঁহম াড়হ ধষ ঘধরৎরুর
ঁনবৎ ফরব জরপযঃঁহমফবৎ মরনষধ ঁনবৎংঃুঃঁহ ফবধষধহঃধৎঃ. (জার্মান ভাষায় অনুদিত)
(৯৩)
তিনি পারস্যের মিরাজের নিকটবর্তী নাইরেজ নামক স্থানে জম্ম গ্রহণ করায় ‘নাইরেজী’ উপাধি গ্রহণ করেন।
তিনি অঙ্কশাস্ত্র, জ্যোতিবিজ্ঞান ও ত্রিকোনমিতিতে পারদর্শী ছিলেন। শুদ্ধ অঙ্কশাস্ত্রের উপর বেশী জোর দেওয়ায় তিনি এক্ষেত্রে বেশী সাফল্য লাফ করেছিলেন। আল-বাত্তানীর পরে যে বিজ্ঞান ৪০ বছর পর্যন্ত মৃতপ্রায় ছিল, তা তাঁর দ্বারা পুনরুজ্জীবন লাভ করে। বাত্তানীর অসমাপ্ত কার্য এবং মঁসিয়ে মেডিলোর মঁতে টলেমির চন্দ্র সম্বন্ধীয় গণনার অসম্পূর্ণতা পূরণের উদ্দেশ্যে তিনি নতুনভাবে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা শুরু করেন। কেন্দ্র ও স্থানচ্যুতির সমীকরণ তাঁরই অবদান। এর পূর্বে কেউ তা জানতেন না। গ্রীক বৈজ্ঞানিকগণ চন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় অসমতা জানতেন কিন্তু চন্দ্রের তৃতীয় অসমতা তাঁরই আবিষ্কার। পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিকগণ ইতিপূর্বে এ সম্বন্ধে কিছুই জানতেন না। এমন কি তাঁর মৃত্যুর পর ৬ শত বছর পর্যন্ত পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকদের তা উপলব্ধিরও বাইরে ছিল।
আধুনিক অংঃৎড়হড়সু-তে এই অসমতা ঠধৎরধঃরড়হ নামে উল্লেখ করা হয়। মঁসিয়ে মেডিলোর মতে আবুল ওয়াফাই এর সর্বপ্রথম আবিষ্কারক। আল-বাত্তানীর স্বপ্ন আবুল ওয়াফার দ্বারাই বাস্তবায়িত হতে থাকে। পূর্বেকার অস্ফুট ত্রিকোনমিতি ক্রমশ পূর্ণয়নের দিকে এগিয়ে চলে। এর উপপাদ্য, প্রমাণ, প্রমাণিত বিষয়াদি সুষ্ঠ নিয়মে প্রচলন করেন। আবুল ওয়াফা। দুই কোণের সাইনের সমষ্টি যে সাইন ও কোসাইন দ্বারা নির্ণয় করা যায়, তা প্রথম উদ্ভাবন করেন তিনি। বর্তমান ত্রিকোনমিতির ফরমূলা Ñ
ঝরহ ( অ + ই ) = ঝরহ অ পড়ং ই + পড়ং অ ঝরহ ই
ত্রিকোনমিতির প্রায় প্রাথমিক শিক্ষা Ñকিন্তু আবুল ওয়াফার পূর্ব সম্বন্ধে পর্যন্ত অঙ্কশাস্ত্রবিদদের এ সম্বন্ধে কোন ধারণাই ছিল না। ষোড়শ শতাব্দীর বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক কোপার্নিকাসও যে এই সহজ ফরমুলাটি সম্পূর্ণ অজ্ঞই ছিলেন,
(৯৪) বর্তমান প্রচালিত ফর্মূলা আল ওয়াফা প্রবতিত (হাতের লেখা)
তা তাঁর রচনা থেকেই বোঝা যায়। ওয়াফা গোলকীয় ত্রিভূজের সঙ্গে কোণের সাইন প্রভৃতির সম্বন্ধ স্থাপন করে ত্রিকোনমিতিকে বিজ্ঞানসম্মত করে তোলেন। তিনি সাইনের তালিকা প্রস্তুতের এক নতুন উপায় উদ্ভাবন করেন। বাত্তানীর অসমাপ্ত কাজ তিনি দুই কোণের সমষ্টির সাইন কোণের অর্ধাংশের সাইনের বর্গের সঙ্গে কোসাইনের সম্বন্ধ কোণের সাইনের সঙ্গে সেই কোণের অর্ধেকের সাইনের ও কোসাইনের সম্বন্ধ যুক্ত প্রথম ত্রিকোনমিতিরও তিনিই প্রবর্তক। ত্রিকোনমিতিতে প্রচলিত ছয়টি সংখ্যায় পরস্পরের মধ্যে যে সাধারণ সম্বন্ধ বিদ্যমান, তিনি সেটিকে সম্পূর্ণভাবে প্রচলন করেন। বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন ফরমূলা এই সাধারণ সম্বন্ধের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।
তিনি ইউক্লিডের একটি ভাষ্য লিখেন জ্যামিতিতে নানা উপপাদ্য ও সম্পাদ্যের অভূতপূর্ব সমাধানে তাঁর অসামান্য প্রতিভার পরিচয়ের মধ্যে এ-ও অতি বিস্ময়কর যে, তিনি কোথাও ভারতীয় সংখ্যা লিখন পদ্ধতি ব্যবহার করেন নি।
গ্রীক ভারতীয় অনুকরণের দরুন এতকাল বিশুদ্ধ জ্যামিতিক আলোচনার অবসর মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের হয়ে উঠেনি। বনি মুসা ভ্রাতৃত্রয় ও আবুল ওয়াফাই প্রথম বিশুদ্ধ জ্যামিতির
গবেষণায় ব্রতী হন। এ সম্বন্ধে তিনি একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর হস্তলিখিত আরবী ভাষার গ্রন্থটি অধুনা লুপ্ত। তাঁর ছাত্রের রচিত এর পারসী অনুবাদ গ্রন্থটিই তাঁর প্রমাণ পুস্তক হয়ে আছে। এই গ্রন্থে জ্যামিতির অত্যন্ত জটিল বিষয়গুলো অতি সহজতর করে প্রকাশের নবতম পন্থা উদ্ভাবন করা হয়েছে।
কণিকে অধিবৃত্তের অঙ্কন ক্ষেত্রফল স্থিতিকরণ ও ঘনফল নির্ণয় সম্বন্ধে তিনি অনেক উন্নত আলোচনা করেন। বীজগণিতে ডাওফেন্টের অনুবাদের মধ্যে তার অসাধারণত্বের প্রমাণ রয়েছে। ঐতিহাসিক ত্যাজোরীর মতে তিনিই গ্রীক গ্রন্থের সর্বশেষ অনুবাদক। তাঁর পরে আর গ্রীক গ্রন্থের অনুবাদ হয়নি।
তিনি আল-খাওয়ারিজমীর বীজগণিতের একটি ভাষ্য প্রণয়ন করেন। তৃতীয় ও চতুর্থ মাত্রার সমীকরণের কিছুটা আলোচনা করেন।
(৯৫)
অন্যান্য আরব বৈজ্ঞানিকের মতো আবুল ওয়াফারও লিখিত বহু মূল্যবান গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায় না। কেবল আবুল ফারদাসের ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ ছাড়া তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাঁর যে যে গ্রন্থ পাওয়া যায়, তা হলো।
১. অঙ্কশাস্ত্রীয় পুস্তক ‘কিতাব ফি মাইয়াহ্তাজ ইলায়হি আল-কুত্তাব ওয়াল ওম্মান ইলমুল হিসাব’ ব্যবসা সংক্রান্ত পুস্তক।
২. ‘আল কিতাবুল কামিল’। এই গ্রন্থের কতকাংশ ক্যারা দ্য গে কতৃর্ক ল্যাটিনে অনুদিত হয়েছে।
৩. ‘কিতাবুল হান্দামা’ ব্যবহারিক জ্যামিতি।
৪. ‘কিতাবুল মানাজিল ফিল হিসাব’অঙ্কের ক্রমিক স্তরের পুস্তক।
৫. ‘কিতাবুল মাদখিল’ অঙ্কশাস্ত্র।ৎ
৬. ‘কিতাবুল বারাহিন ফিল কাদায়া ফি মা স্তামখাস্ত দাওয়োফালতোম ফি কিতাবিহ্’।
৭. ‘কিতাবুল ইমতিখরাজ... ’।
৮. আল- মাজেস্ত।
৯. ঝবীধমবংরসধষ-এর তালিকা গ্রন্থ।
(৯৬)
ইউসুফ আল-ঘুরী
তাঁর বৈজ্ঞানিক কার্যাবলী প্রধানত শুদ্ধ অনুবাদেই সিদ্ধ। আকিমিডিসের অধুনা-লুপ্ত ত্রিভুজ সম্বন্ধীয় ও গ্যালেনের গ্রন্থ অনুবাদ করেন। প্রথম অনুবাদ গ্রন্থটি মিনাল ইবনে সাবিত ইবনে কোরা এবং দ্বিতীয়টি হুসায়ন ইবনে ইসহাক পুনসংস্কার করেন। পদার্থবিদ্যা সম্বন্ধে আরো কয়েকটি বই তিনি অনুবাদ করেন।
আন্তরলব ইত্যাদি যন্ত্র নির্মাণ কার্যে গ্যালেন এবং টলেমির সমতুল্য ছিলেন।
তিনি আরবী এবং পারসী ভাষাতে কয়েকটি বিজ্ঞান গ্রন্থ রচনা করেন।
(৯৭)
খলীফা মুকতাদিরের (৯০৮-৯৩২) রাজত্বকালে তিনি যোগ্য চিকিৎসক হিসাবে মক্কা-মদীনার হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক ও পরিদর্শক নিযুক্ত হন। তিনি উৎকৃষ্ট অঙ্কশাস্ত্রবিদ
ও অনুবাদক ছিলেন। প্যাপাসের ভাষ্য ও ইউক্লিডের দশম পুস্তকের অনুবাদই সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য।
ইউরোপের পুনর্জাগরনে (হাতের লেখা)
তিনি মিসরের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আবু কামিলের বীজগণিতের ভাষ্য লিখে বশস্বী হন। তাঁর জ্যোতিবিজ্ঞানী গবেষণার কতগুলো গ্রন্থের মধ্যে একটি দ্বাদশ শতকে বার্সিলোনার মাভা মোউন কর্তৃক দঙহ ঃযব পযড়ড়ংরহম ড়ভ ধঁংঢ়রপরড়ঁং ফধুং’ বা ‘শুভ দিবস নির্ণয় বিষয়ক পুস্তক’ নামে অনুদিত হয়।
(৯৮) পদার্থ বিজ্ঞানি আবদুল রহমান সুফী
অঙ্কবিদ, জ্যোতিবিজ্ঞানী ও পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি বুয়াইদের বাদশাহ্ ও অঙ্কশাস্ত্রবিদ বিজ্ঞানী আজদ্দৌলার বন্ধু ও শিক্ষক ছিলেন।
বংশ প্রতিষ্ঠার চার বছর পরেই সুযোগ্য সুশিক্ষিত বৈজ্ঞানিক বাদশাহ্ আজদ্দৌলার আবির্ভাব ঘটে। মুসলিম জ্যোতিবিদদের মধ্যে স্থির নক্ষত্রাদি বিষয়ে ও নানা সমস্যা সম্বন্ধে গ্রন্থ প্রণয়ন করে তিনি প্রসিদ্ধ হন। গ্রন্থটির নাম হলো ‘কিতাবুল কাওয়াকিব আস-সাবিতা আল-মুছাওয়ার’ বা স্থির নক্ষত্রাদি বিষয়ক পুস্তক। অনেকে মনে করেন-মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে জ্যোতিবিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ সম্বন্ধে যে তিনটি সর্বোৎকৃষ্ট পুস্তক আছে, তম্মধ্যে এটি অন্যতম। অন্য দুটির লেখক হলেন ইবনে ইউনুস ও পঞ্চদশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক উগুল বেগ।
(৯৯)
তিনি একটি জ্যোতিবিজ্ঞান তালিকা প্রস্তুত করেন। এই তালিকা পরবর্তী ২ শত বৎসর পর্যন্ত সমাদৃত থাকে।
ইউরোপের পুনর্জাগরনে
হামদানীর সুলতান সায়ফুদ্দৌলার উসাহ ও সহায়তায় তাঁর বিজ্ঞান সাধনা সাফল্য লাভ করে। তিনি জ্যোতিবিজ্ঞানে বিখ্যাত ছিলেন।
তাঁর গ্রন্থবলীর মধ্যে ‘আল-মাদখাল ইলামিনাত আহকাম আন নজুম’ বা জ্যোতিষশাস্ত্রের উপক্রমণিকা এবং গ্রন্থসমূহের সর্বসূত্রে অবস্থান বিষয়ক (ঞৎবধঃরংব ড়হ ঈড়হলঁহপঃরড়হ ড়ভ ঃযব ঢ়ষধহবঃং) দুটি গ্রন্থ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জোহানেস এই দুটি গ্রন্থ ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন। এই বৈজ্ঞানিকের প্রথম গ্রন্থ দুটি হিসপালেনসি কর্তৃক অন্যরূপ ইংরেজী নামে অনুদিত হয়। এই অনুবাদটি জোহানেসের ভাষ্যসহ ১৪৭৩ খৃস্টাব্দে বোলোগনায় প্রকাশিত হয় এবং ১৪৮১, ১৪৮২, ১৪৮৫, ১৪৯৯, ১৫২১ খৃস্টাব্দে ভেনিসে পুনর্মুদ্রিত হয়। এই গ্রন্থটির ফ্রান্সের গণিতবিদ উৎড়হপব ভরাব
(১০০)
(১৪৯৪-১৫৫৫) ঞৎধরঃব ফবং পড়হলঁহপঃরড়হ ফব ঢ়ষধহবঃবং নাম দিয়ে ১৫৫৭ খৃস্টাব্দে প্যারিসে পুনঃ প্রকাশ করেন।
এই বংশের সুলতান আজদ্দৌলার মৃত্যুর পর শামস-উদ-দৌলা (৯৮৬-৯৮৯) সিংহাসনারোহণ করেন। কিন্তু তিন বছর যেতে না যেতেই তাঁর ভ্রাতা শরফুদ্দৌলা কর্তৃক
বলপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত হন। ৯ বছর রাজ্য শাসনের পর তাঁর ভ্রাতা বাহা-উদ-দৌলা (৯৯৮-১০১২) শরফ-উদ-দৌলাকেও শাসন মক্ষতা থেকে বিতাড়িত করে ক্ষমতাসীন হন।
উল্লেখ্য যে, রাজ্য ব্যাপী এত যুদ্ধ ঝগড়া-ঝাঁটি, ষড়যস্ত্র, সন্ত্রাসের মধ্যেও জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার কোন প্রকার ব্যাঘাত ঘটেনি। জ্ঞান-বিজ্ঞান ছিল আশ্চর্যজনকভাবে সবার ঊর্ধ্বে। এভাবেই বুয়াইয়া বা বুয়াইদ বংশের শাসন ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় আরব সভ্যতা ও বিজ্ঞানের বহু অবদান গড়ে উঠেছিল। এই সা¤্রাজ্যে যেসব বিজ্ঞান মনীষী অভ্যুদয় লাভ করেছিলেন, তম্মধ্যে আবদুর রহমান সুফী আল-কুহী আবুল ওয়াফা প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিখ্যাত চিন্তাবিদ বৈজ্ঞানিকগণ, যাদের ‘উখওয়ানুস সাফাহ’ নামে অভিহিত করা হয়, যাঁরা কোন দিন বিজ্ঞান সাধনায় রাজাশ্রয় গ্রহণ করেন নি, তাঁদের অভ্যুদয়ও বুয়াইদ বংশের রাজত্বকালেই হয়েছিল।
গণিত ও জ্যোতিবিজ্ঞান সম্বন্ধে আল-কুহী বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। জ্যামিতির উপরই তাঁর অনুরাগ বেশি ছিল। আকিমিডিসও এপোলোনিয়াসের জ্যামিতিক সমস্যাবলীকে কেন্দ্র করেই তিনি তাঁর জ্যামিতিক গবেষণায় নিমগ্ন হন। এই গবেষণা থেকেই তৃতীয় ও চতুর্থ মাত্রা সমীকরণের সমাধানের সমস্যা দেখা দেয়।
(১০১)
এর কতকগুলোর অনেকগুলোরই সমাধানে তিনি সাফল্য লাভ করেন এবং সমাধানের পদ্ধতি বের করেন। এর একটি হলো কোন নির্দিষ্ট গোলকের কোন অংশের সমান- ঠড়ষঁসব অন্য একটি অংশ অঙ্কন করার পদ্ধতি।
মারটনের মতে, আল-কুহীর জ্যামিতিই আরব জ্যামিতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।
বুয়াইদ বংশের উত্থান-পতনে রাজনৈতিক সংঘর্ষের প্রমাণ যা-ই থাক, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনায় শাসকগণ ছিলেন খুবই উৎসাহী।
৭৫০ খৃস্টাব্দের পর থেকেই ভারতের সঙ্গে আরবদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সংযোগ বিনিময় ছলছিল।
৮০১ খৃস্টাব্দের পূর্বেকার বাগদাদের খিলাফতের মুদ্রা বাংলার একটি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসস্তুপের আবিষ্কারের প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং যে কোন সূত্রে বাংলার সঙ্গে আরবের যোগসূত্র ছিল।
তখন বাংলায়ও জ্ঞানের চর্চা পূর্ণমাত্রায় চলছিল। এতে আরব সভ্যতারও সংস্পর্শ-সংযোগ ছিল কিনা, তা ঐতিহাসিকদের বিবেচ্য বিষয়। বিশেষ শিক্ষাবিদ প-িত সতীশ দীপঙ্কর (৯৮২-১০৫৪) বাংলার সোনারগাঁয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। এরপর তিব্বতে গিয়েও আজীবন জ্ঞানের সাধনা করেন। তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞান ও কারিগরি বিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
(গ) (৩)
কণিকের বৃত্তির ছেদ-নিয়ে বিশদভাবে গবেষণা করেন। কোণ ত্রিখ-িত করার পূর্বেকার করহবসধঃরপধষ পন্থা বাদ দিয়ে শুদ্ধ জ্যামিতিক সমাধান প্রবর্তন করেন। একটি বৃত্ত এবং সমভুজ হাইপারবোলার অন্তঃছেদ দিয়ে। তিনি এই সমাধানটির যে নাম দেন, তার ইংরেজী দাঁড়ায় ‘গড়নরষব এবড়সবঃৎু’।
পদার্থবিদ জড়ুধষ ঝপরবহপব ঈড়হভবৎবহপব
তিনি ছিলেন বুয়াইদ বংশের আমীর। এটাই তাঁর প্রকৃত পরিচয় নয়। তিনি অঙ্কশাস্ত্রবিদ, জ্যোতিবিজ্ঞানী প-িত ব্যক্তি-এটাই তাঁর মুল পরিচয়। বিখ্যাত পদার্থবিদ আবদুর রহমান সুফী ছিলেন তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু।
সুলতান আজদ-উদ-দৌলাহ প্রতি বছর একটি ব্যাপক বিজ্ঞান সভা ডাকতেন। দেশের সর্বস্তরের জ্ঞানী-গুণীগণ এই কনফারেন্সে যোগদান করতেন। এতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের মনোজ্ঞ আলোচনা হতো। সুলতান পদমর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে আলোচনায় যোগ দিতেন।
মুকতাদির বিল্লাহ্ (আবুল ফজর জাফর) নাম ধারণ করে খলীফা হিসাবে ক্ষমতাসীন হন। তিনি যে কেবল বিজ্ঞান সম্মিলনীতেই যোগদান করতেন তা-ই নয়, সাধারণ বৈজ্ঞানিকদের সাথে মিলেমিশে মানমন্দিরে বসে গ্রহ-নক্ষত্রাদির পর্যবেক্ষণ কাজেই তাঁর অনেক সময় কেটে যেত। অঙ্কশাস্ত্রের মধ্যে জ্যোতিবিজ্ঞানেই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি। ধুমকেতুর প্রতিও তাঁর আকর্ষণ ছিল। ধুমকেতু সম্পর্কে তিনি কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
(১০৩)
শরফ-উদ-দৌলার জ্যোতিবিজ্ঞানের প্রতি এত আগ্রহ ছিল যে তাঁর রাজপ্রাসাদের উদ্যানে একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই মানমন্দির থেকে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির পর্যবেক্ষণ কার্য চলত। অনেক সময়ই আমীর স্বয়ং এই পর্যবেক্ষণ কার্যে যোগদান করতেন। বিখ্যাত গণিত শাস্ত্রবিদ আল-কুহী ছিলেন এর অধ্যক্ষ। অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যাঁরা এই মানমন্দিরে কাজ করতেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন আল-আস্তরলবী, আবু ইসহাক, ইবরাহীম ইবনে হিলাল, আবুল ওয়াফা প্রমুখ।
তিনি ইয়েমেন প্রদেশের জন্যে একটি জ্যোতিবিজ্ঞান তালিকা প্রস্তুত করেন। তিনি নিজের প্রদেশ ও অন্যান্য তথ্য সমন্বায়ে ‘আল-ইথিল’ নামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। এতে পূর্বেকার আরবদের জ্যোতিবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, সৃষ্টিবিজ্ঞান প্রর্ভতি সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনার স্থান লাভ করে।
বৈজ্ঞানিক সংস্থা ইখওয়ানুস সাফাহ প্রাচীন ইসলামী বৈজ্ঞানিক সংস্থা (হাতের লেখা)
কতিপয় উচ্চস্তরের বৈজ্ঞানিক সন্বয়ে গঠিত একটি বৈজ্ঞানিক সংস্থা। এরা ছিলেন রাজাশ্রয়ের বাইরে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বিজ্ঞান-সাধক দল। বাইরে এদের কোন ঝাঁকজমক ছিল না। কাউকেই জানতে না দিয়ে নীরবে কাজ করে যাওয়াই ছিল ওঁদের নীতি।
পরবর্তীকালে ফ্রাগেল ও ডিটিরিসির বিশেষ অনুসন্ধানের ফলে ওঁদের সম্পর্কে কিছু কিছু জানা যায়। ওঁদের দলে ছিলেন ৬ জন বৈজ্ঞানিক।
(১০৪)
কিন্তু ঐতিহাসিক মাহারজুরি মাত্র ৫ জন বৈজ্ঞানিকের নপাম উল্লেখ করেন। যথা-
১. ... ... আলমুকাদ্দমী, ২ এ ... ... আল জানজানি, ৩. মুহাম্মদ বিন আহমদ আল-মাহারজুরি, ৪. আল-আওফি ৫. জায়েদ বিন রাফ’আ।
এই প্রতিষ্ঠান ৯৮১ খৃস্টাব্দে গঠিত হয় বলে মনে করা হয়।
ফ্রাগের মতে এঁদের ‘রামযায়নে ইখওয়ানুস সাফাহ্ প্রকাশ হয় ৯৭০ খৃস্টাব্দে।
এঁদের উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান ও দর্শনের সঙ্গে ইসলামিক আইন-কানুনের সামঞ্জস্য বিধান। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপর এঁরা ৫২টি পুস্তক প্রণয়ন করেন।
এই ৫২টি গ্রন্থের ১৪টি গণিত ও ন্যায় বা তর্কশাস্ত্র। ১৭টি প্রকৃতি বিজ্ঞান ও ভুতত্ত্ববিদ্যা। ১০টি মনোবিজ্ঞান এবং ১১টি ধর্মতত্ত্ব, জ্যোতিষবিজ্ঞান ইত্যাদি। এইগুলো পরসী, হিন্দী এবং তুর্কী ভাষায় অনুদিত হয়।
১. লেখাপড়া ২. ব্যাকরণ ও শব্দকোষ সঙ্কলন ৩. গণনা ও হিসাব ৪. ছন্দ প্রকরণ ও কাব্যকলা ৫. প্রতীক বিজ্ঞান ৬. রসায়ন, ম্যাজিক, ভোজবাজি সম্বন্ধে জ্ঞান ৭. ব্যবসা-বাণিজ্য ৮. ক্রয়-বিক্রয় বাণিজ্য নীতি, কৃষি-কার্য ও পশু পালন সম্বন্ধে জ্ঞান ৯. জীবন বৃত্তান্ত।
(১০৫) প্রাচীন ইসলামী বিজ্ঞান সংস্থা (হাতের লেখা)
প্রকৃত বিজ্ঞানের তাঁর জোয়ার ভাটা, ভূমিকম্প, গ্রহণ, বায়ু কম্পনে শব্দের উৎপত্তি প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করেন। দুটি বিভিন্ন প্রকারের শব্দ তরঙ্গের মিশ্রণের কথা তাঁরাই প্রথম আবিষ্কার করেন। রসায়ন বিজ্ঞানে ধাতুর গঠন সম্বন্ধে জাবির ইবনে হাইয়ানের মতানুসরণ করেন। এরিস্টটলের চারটি মূল পদার্থের কথাও উল্লেখ করেন।
শুদ্ধ-অঙ্কশাস্ত্রের মধ্যে ম্যাজিক স্কোয়ার ও অন্যান্য গণিত তত্ত্ব এবং জ্যোতিষ বিদ্যা সম্বন্ধে মনোজ্ঞ আলোচনাও এতে স্থান পেয়েছে।
ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে ১. কুরআন শরীফ ২. কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা তফসির জ্ঞান ৩. হাদীস শরীফ ৪. ফিক্হ ৫. আধ্যাত্মিক বা সুফীতত্ত্ব।
ইখওয়ানুস সাফাহ্র মনীষিগণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব সভ্যতায় যাবতীয় সঙ্গীত জ্ঞান-বিজ্ঞান একত্রিভুত করে তুলে ধরে ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করা, এজন্যে তাঁদের কার্যপদ্ধতি ছিল সমাবেশিক এবং সর্বব্যাপক। এই সাধক মনীষীদের সম্বন্ধে ডিটিরিসি বলেন, “এতদিন পর্যন্ত যে পরিমাণ জ্ঞান মানুষের আয়ত্তে এসেছে, তাকে একত্রিত করে সম্বন্ধীভূত এবং বস্তুতান্ত্রিক ও আধ্যাত্মিক জগতের জন্যে একটি সমাবেশিক মত তৈরী করা, যাতে তদানীন্তন কৃষি ও সংস্কৃতি অনুযায়ী সমস্ত প্রকার প্রশ্নের সহজ উত্তর দেবার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।”১
এই স্থানেই বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম নিউটন মুহাম্মদ বিন মুসা আলÑখাওয়ারিজমী জম্মগ্রহণ করেন।
দ্বিতীয় মনসুরের পুত্র খলীফা দ্বিতীয় নুহের মন্ত্রী আবুল ওতাব ছিলেন আবদুল্লাহ্র পৃষ্ঠপোষক। তিনি পৃথিবীর সর্বপ্রথম এবং সর্ব প্রাচীন ‘মাফাতাহিল উলুম’ নামক এক বৃহদাকার বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়া প্রণয়ন করেন।
১. বিজ্ঞানে মুসলমানের দান ঃ এম. আকবর আলী, পৃষ্ঠা ১৫৭।
তিনি পুস্তক বিক্রেতা ছিলেন। সমাজ ছিল উচ্চস্তরের শিক্ষিত লোকের সঙ্গে। তিনি নিজেও উচ্চশিক্ষিত প-িত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ‘ফিহরিস্ত’ নামক একটি প্রামাণ্য ঐতিহাসিক বিশ্বকোষ রচনা করেন।
বিখ্যাত প-িত ব্রকেলম্যান ‘ফিহরিস্ত’ সম্বন্ধে মন্তব্য প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আবুল-ফারাজ’ এই ফিহরিস্তে বা তালিকায় তখনকার দিনের সমস্ত আরবী পুস্তকের, তা মৌলিক রচনাই হোক বা অনুবাদই হোক-একটি তালিকা দিয়েছেন। এতে তিনি প্রথম বিভিন্ন প্রকারের লিখন পদ্ধতির কথা বর্ণনা করেন, বিভিন্ন ধর্মের প্রেরিত পুস্তকের কথা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
গুপ্ত বিদ্যা পর্যন্ত কোন বিষয়ই তাঁর নজর এড়াইনি। তিনি প্রত্যেক সাহিত্য ও বিজ্ঞান শাখাকে ভাগ ভাগ করে সেই ভাগে ভাগে লেখকদের নাম সন্নিবেশ করার পর যথাসম্ভব পর্যায়ক্রমে তাঁদের জীবন ও কাজের সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। ইতিহাসের দিক থেকে গ্রন্থখানা অমূল্য। সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও
(১০৭)
শুধু মুসলিম মনীষীদের নিয়েই তিনি আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখেন নি, য়াহূদী ও ইরানী সভ্যতা নিয়েও আলোচনা করেন।
যদিও তিনি খৃস্টান বৈজ্ঞানিক ছিলেন, তবু বহু গ্রীক বিজ্ঞান গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন। তম্মধ্যে খিওডোনিয়াম, এরিস্টারকাম, অটোলাইকাম, হিপসিকলম এবং ডাওফেন্টের গ্রন্থাবলীর আরবী অনুবাদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চিকিৎসা, জ্যোতিবিজ্ঞান, অঙ্কশাস্ত্র প্রভৃতি সকল বিষয়ের উপরই অনুবাদে দক্ষতা প্রকাশ করেন। লুকার গুণন পদ্ধতিতে আরবরা ‘০’ শূন্য কি ভাবে ব্যবহার করতেন, তাঁর সুন্দর নিদর্শন রয়েছে।
স্পেনের খলীফা আবদুর রহমানের পুত্র। যদিও তিনি খলীফা ছিলেন তবু তাঁকে ‘গ্রন্থকীট’ বলা হতো। তাঁর কর্ডোভার লাইব্রেরীতে ৪ লক্ষাধিক গ্রন্থ সংগৃহীত হয়। প্রত্যেক গ্রন্থ তিনি যতœ সহকারে পাঠ করে পার্শ্বে টীকা লিখে রাখতেন।
কর্ডোভার অধিবাসী ছিলেন। অঙ্ক ও জ্যোতিবিজ্ঞানের উপর কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন।
(১০৮)
খাওয়ারিজমীর জ্যোতিবিজ্ঞান পুনঃসংস্কার করেন এবং পূর্বতন পারসী গণনা আরবী করেন। তিনি শ্রেষ্ঠ অঙ্কবিদ ছিলেন। অঙ্কশাস্ত্র, জ্যোতিবিজ্ঞান ও এমিক্যাবল নাম্বারের উপর গবেষণামূলক কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। আস্তারলব সম্বন্ধেও তিনি একটি গ্রন্থ লিখেন। টলেমির প্লেনিসফেরিয়াম-এর ভাষা ও ব্যবসায়ী গণিত বিষয়েও গ্রন্থ লিখেন। গণিত পুস্তকটির নাম হলো ‘আল-মুয়ামালাত’। তাঁর আস্তরলব সম্বন্ধীয় গ্রন্থটি জোহানেস কর্তৃক ল্যাটিনে অনুদিত হয়। তিনি ‘রুতবাতুল হাকিম’ এবং ‘গায়ানুল হাকিম’ নামে রসায়ন শাস্ত্রের উপর দুটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। দ্বিতীয় গ্রন্থটি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আল-ফানসোর আদেশে ল্যাটিনে অনুদিত হয়।
মিসরের অধিবাসী ছিলেন। অঙ্কশাস্ত্র, জ্যামিতি ও বীজগণিতের উপর মৌলিক আলোচনা করেন। জ্যামিতির পঞ্চভুজ ও দশভুজে তাঁর অবদান রয়েছে। ইতিপূর্বে জ্যামিতি ত্রিভুজ পার হয়ে বহু ভুজে এসেছিল। তিনি তাঁর সীমাকে সম্প্রসারিত করে সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্র সৃষ্টি করেন। তিনি সাবিত ইবনে কোরার আদর্শ অনুসরণে জ্যামিতির প্রতিপাদ্য ও উপপাদ্যের মীমাংসায় সমীকরণ প্রয়োগ করেন। বিশেষভাবে সমীকরণের সাহায্যে জ্যামিতির সমস্যাগুলোর সমাধান করেন। এভাবে সমীকরণের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করে জ্যামিতিক মীমাংসা সম্ভব করাই ছিল তাঁর নিজস্ব অবদান। এজন্যে তাঁকে দশম শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শুদ্ধ অঙ্কশাস্ত্রবিদ বলা চলে। অঙ্কের এই দুই শাখায় তিনি অনেকগুলো গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। অঙ্কের সাঙ্কেতিক নিয়মগুলো আবিষ্কার।
(১০৯)
ইয়াহূদী বৈজ্ঞানিক। তিনি এই সময় কায়রোর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষালাভ করে, পরে ব্যাবিলনে বিজ্ঞান শিক্ষাদানে রত হন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন