হালাল শিল্প কী, এ খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কতটা?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফরে গেলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর যে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়, সেখানে হালাল শিল্পের প্রসঙ্গটি গুরুত্ব পায়। ফলে অনেকের মধ্যেই কৌতূহল তৈরি করেছে, হালাল শিল্প বিষয়টি আসলে কী? দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতির বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা স্বীকার করেন এবং বাংলাদেশের হালাল খাতের উন্নয়নে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে সম্মত হন। খবর বিবিসির।
এর আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তখনকার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া সফরেও হালাল শিল্প প্রসঙ্গটি আলোচনায় এসেছিল।
মালয়েশিয়ার একটি সংবাদ মাধ্যমকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তখন বলেছিলেন, আমাদের সম্পদ একত্র করতে পারলে হালাল খাতই হবে ঢাকা ও পুত্রজায়ার মধ্যে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির সবচেয়ে স্বাভাবিক ক্ষেত্র।
কিন্তু প্রশ্ন হলো হালাল শিল্প আসলে কী? মালয়েশিয়ার হালাল শিল্পে কোন কোন খাত আছে এবং বাংলাদেশ এই হালাল শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা কতটা আছে?
কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (কমার্শিয়াল) প্রণব কুমার ঘোষ বিবিসি বাংলাকে বলেন, মালয়েশিয়া হালাল শিল্পের বৈশ্বিক রোল মডেল। এ খাতে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে এবং এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে পারলে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য 'গেমচেঞ্জার' হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ বলেন, হালাল শিল্প খাতে মালয়েশিয়া চ্যাম্পিয়ন দেশ। সে কারণে তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বৈশ্বিকভাবে প্রায় তিন ট্রিলিয়ন ডলারের 'হালাল অর্থনীতিতে' শক্ত অবস্থান তৈরির সুযোগ বাংলাদেশ নিতে পারে।
তিনি বলেন, আমাদের বড় সমস্যা হলো সার্টিফিকেশন বা সনদ দেওয়া নিয়ে। ভালো ল্যাবরেটরি করে সার্টিফিকেশন সমস্যা কাটিয়ে তোলা গেলে বাংলাদেশ হালাল খাতে ভালো করবে।
হালাল শিল্প আসলে কী
মো. আনোয়ার শহীদ বলছেন, হালাল শিল্প হলো একটি ইকো-সিস্টেম- যার মধ্যে ব্যাংকিং, ট্যুরিজম, হালাল হোটেল ইন্ডাস্ট্রি, হালাল লজিস্টিক, হালাল ফার্মাসিকউট্যিালসহ অনেক ধারণা আছে।
আর প্রণব কুমার ঘোষ বলছেন, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি এটি একটি বৈশ্বিক ধারণা এবং খাদ্য থেকে শুরু করে পোশাক পর্যন্ত অনেক কিছুই এই ধারণার মধ্যে আছে।
মালয়েশিয়া হালাল শিল্প নিয়ে যে মাস্টার প্ল্যান করেছে সেখানে বলা হয়েছে, হালাল ইকোসিস্টেম হলো এমন একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক, যেখানে হালাল পণ্য ও সেবার উৎপাদন, উন্নয়ন, সরবরাহ এবং বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদান একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
এই উপাদানগুলো সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখে। ইকোসিস্টেমের প্রতিটি অংশের নিজস্ব কার্যক্রম থাকলেও তারা পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত, যার ফলে একটি টেকসই ও ক্রমবর্ধমান ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
অর্থাৎ উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে যাওয়ার প্রতি স্তরে হালাল পদ্ধতি বা উপকরণ ব্যবহার করে যেসব শিল্প গড়ে উঠে সেটিই হালাল শিল্প।
মালয়েশিয়ার হালাল শিল্প কতটা বিস্তৃত
ব্যবসায়ী ও হাই কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, হালাল শিল্পে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা প্রায় ৪০ বছরের এবং হালাল শিল্পের বিকাশ ও মানোন্নয়নে মালয়েশিয়া বিশ্বে পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে।
দেশটিতে হালাল পণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর ফলে মালয়েশিয়া হালাল পণ্যের নিট আমদানিকারক দেশ।
দেশটির সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালে মালয়েশিয়ার হালাল মার্কেট হবে ১১৩ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০১৮ সালে ছিল ৬৮ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে ফুড ও বেভারেজ খাত ২০৩০ সালে হবে ৮৫ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০১৮ সালে ছিল ৫১ বিলিয়ন ডলারের ।
এর বাইরে কসমেটিক ও পার্সনাল কেয়ার, ফার্মাসিউটিক্যালস সেক্টরও হালাল শিল্পে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকবে।
হালাল শিল্পে দেশটির ৯টি খাত অন্তর্ভুক্ত আছে। এগুলো হলো– ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, কসমেটিক ও পার্সনাল কেয়ার, ইনগ্রিডিয়েন্টস, ফার্মাসিউটিক্যালস, মডেস্ট ফ্যাশন, মেডিকেল ট্যুরিজম ও ডিভাইসেস, মুসলিম ফ্রেন্ডলি হাসপাতাল, লজিস্টিক সার্ভিস ও ইসলামিক ফাইন্যান্স।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা কতটা ও চ্যালেঞ্জ কোথায়
বাংলাদেশে ২০২৩ সালে ইসলামী শরিয়া মোতাবেক পণ্য উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি ও বাজারজাতকরণের সুবিধার্থে 'হালাল সনদ নীতিমালা-২০২৩' নামে একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল।
তখন বলা হয়েছিল কোনো পণ্যের হালাল স্বীকৃতি পেতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছে আবেদন করে হালাল সনদ ও লোগো নিতে হবে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে।
এর আগে ২০২১ সাল থেকে হালাল সনদ দিয়ে আসছিল বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। ফলে দুটি সংস্থাই হালাল সনদ দেওয়ার কাজ করে আসছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে মাত্র ৮৫ কোটি ডলারের মতো হালাল পণ্য রপ্তানি করে, যার বেশিরভাগই কৃষিভিত্তিক পণ্য।
তারা এখন পর্যন্ত ২৮০টির মতো প্রতিষ্ঠানকে হালাল সনদ দিয়েছে। যদিও দুই প্রতিষ্ঠান আলাদা সনদ দেওয়াটা নতুন জটিলতা তৈরি করছে বলে অভিযোগ আছে ব্যবসায়ীদের।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল সনদ বিভাগের উপ-পরিচালক ড. মাওলানা মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী বলছেন, হালাল খাতে অনেক সম্ভাবনা থাকলেও সত্যিকার অর্থে সুফল পেতে হলে আরও অনেক পদক্ষেপ সরকারকে নিতে হবে।
তিনি জানান, এসব কারণেই হালাল সনদ দিয়ে মাংস ও মাংসজাত দ্রব্য মালদ্বীপ ছাড়া কোথাও পাঠানো যাচ্ছে না নানা সংকটের কারণে। একটি হালাল অর্থনৈতিক জোন এর সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে।
এরপরেও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, মালয়েশিয়ায় শুধু হালাল খাবার নয়, হালাল হোটেল, ঔষধের বাজার ও পর্যটনেও বড় সুযোগ রয়েছে। এমনকি দুই দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও একযোগে কাজের সুযোগ নিতে পারে।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তা প্রণব কুমার ঘোষ বলছেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় সবকিছুই হালাল এবং সে কারণে শিল্প খাত হিসেবে হালাল শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা এখানে ব্যাপক।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দেড় হাজার কোটি ডলারের হালাল খাদ্য আমদানি হয়, যা ২০৩০ সাল নাগাদ পাঁচ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের দিক থেকে সরকারিভাবে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারলে বাংলাদেশ এই বাজারেই কয়েক বিলিয়ন ডলারের হালাল খাদ্য রফতানির সুযোগ নিতে পারে বলে ব্যবসায়ীদের এই সংগঠনটি মনে করে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডা হালাল খাত নিয়ে মালয়েশিয়ার এইচডিসির কাছে কাজ শুরু করেছে।
বিএমসিসিআই সভাপতি আনোয়ার শহীদ বলছেন, সার্টিফিকেশন বা সনদ সমস্যার কারণে এখন বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল।
আনোয়ার শহীদ জানান, তারা হালাল শিল্প নিয়ে আগামী মার্চে একটি সম্মেলন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন যাতে করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারকে সহায়তা করা যায়।
হালাল-হারাম
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন